Blog Feed

সিরাজদ্দৌলা: নায়ক না খলনায়ক

সিরাজউদ্দৌলা,ইতিহাসের ট্র্যাজিক নায়ক, না খলনায়ক?

-পিনাকী পাল

“স্বদেশী আন্দোলনের সময় হিন্দু নেতারা মুসলমানদের মধ্যে থেকে নায়ক খোঁজার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিলেন, তাড়াহুড়ো করে তাঁরা তরুণ সিরাজের মতন একজন দুর্বল, অপরিণামদর্শী, দুশ্চরিত্র, নিষ্ঠুর যুবককে প্রতীক নায়ক হিসেবে বেছে নেন, তাঁদের ইচ্ছে অনুসারেই নাট্যকারের সিরাজকে গড়ে তোলেন এক রোমান্টিক, আদর্শবাদী, হিন্দু মুসলমানের সমন্বয়সাধক হিসেবে.. ” অর্ধেক জীবন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

স্কুল ইতিহাসে সিরাজ একজন “স্বাধীনতা সংগ্রামী”, “আমি সিরাজের বেগম” উপন্যাস বা “সিরাজউদ্দৌলা” নাটকের সিরাজ একজন ট্র্যাজিক হিরো, কিন্তু বাস্তবে সিরাজকে কি নায়ক বলা যায়?
সমকালীন কোন তথ্যে, ফার্সি, বাংলা,ফরাসী,ওলন্দাজ, বা ইংরেজি, সিরাজ সম্পর্কে একটিও প্রশংসাবাক্য উচ্চারিত হয় না কেন?

ব্রিটিশদের সঙ্গে সিরাজের শত্রুতা থাকতে পারে, কিন্তু ফরাসীরা? ওরা তো সিরাজের বন্ধু ছিল।

জ্যঁ ল দ্য লরিস্তঁ, যিনি ১৭৬৫ সালে পন্ডিচেরীর গভর্নর নির্বাচিত হন, ১৭৫৬-৫৭ সালে ছিলেন চন্দননগরে। তিনি লিখেছেন “কোন ব্যক্তির কুখ্যাতি সিরাজের থেকে বেশী হতে পারে এটা অকল্পনীয়। এই যুবক ইন্দ্রিয়পরায়ণতা আর নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত। এর চ্যালারা স্নানরত অবস্থায় সুন্দরী হিন্দু রমণীদের তুলে নিয়ে যায় মালিকের মনোরঞ্জনের জন্য। এই যুবকের আর একটি কৌতুক বজরার আঘাতে নৌকাডুবি ঘটানো। অনেকবার মাঝনদীতে সিরাজের বজরার আঘাতে যাত্রীবাহী নৌকা জলে ডুবে বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
নবাব আলীবর্দীর কাছে কোন মন্ত্রী কিংবা উচ্চবংশীয় ব্যক্তির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করার জন্য সিরাজ এগিয়ে আসত। এমন নৃশংসভাবে হতভাগ্যদের হত্যা করা হত যে স্বয়ং নবাব শহরের বাইরের কোন প্রাসাদে আশ্রয় নিতেন যাতে তাদের আর্তনাদ না শুনতে হয়। সিরাজের নাম শোনামাত্র জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হত। এই নির্বোধ যুবকের সরকার চালানোর মত কোন সামর্থ্য নেই, এ শুধু জানে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে, কিন্তু আসলে এ একজন ভীতু।
এই যুবকের প্রকৃতি রুক্ষ, এ কাপুরুষ এবং গোঁয়াড় । এ সামান্য ব্যাপারে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং বদমেজাজী। এ কাউকে বিশ্বাস করে না, এবং কারও বিশ্বাসের দাম দেয় না। শৈশব থেকে রাজকীয় পরিবেশে বড় হলেও এর ব্যবহারের মধ্যে শিক্ষা বা সৌজন্যবোধের লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। “

আরও বিশদভাবে লিখেছেন সিরাজের আত্মীয়, গোলাম হোসেন খান। ” যুবরাজ যাকে পছন্দ হত যৌনতৃপ্তির জন্য তাকেই বেছে নিতেন, এমনকি পুরুষ মহিলা ভেদাভেদ করতেন না। নবাব আলিবর্দী খানের সেনাপতিদের নিয়মিত অপমানিত হতে হত সিরাজের কাছে। তাঁরা মুখ খুলতে ভয় পেতেন কেননা অশ্লীল গালাগালি শোনার সম্ভাবনা থাকত। যুবরাজ আলীবর্দীর অমাত্যবর্গের উপদেশ গ্রহণ করতেন না, এবং অমাত্যগণ উপদেশদানে বিরত থাকতেন, আসলে তাঁরা সিরাজের পতনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
পৃথিবী সম্পর্কে সিরাজ ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ, নিজের কৃতকর্মের কি পরিণাম হতে পারে কখনও চিন্তা করতেন না। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে পাপ পূণ্য, ভালো মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতেন না। এমনকি কোনও সেনা অভিযানের সময় সবচেয়ে সাহসী এবং দক্ষ সেনাপতিদের কটুবাক্যের ছুরিতে বিদ্ধ করতেও বাধত না সিরাজের। রাজ্যের সবাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করত সিরাজের থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য। “

তবে সিরাজের সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল তৎকালীন বাংলার ব্যাঙ্কার জগৎশেঠের সঙ্গে শত্রুতা করে। মনে রাখতে হবে এই জগৎ শেঠ ভ্রাতৃদ্বয়ই( মহাতাব রাই আর স্বরূপচাঁদ)কিন্তু আলীবর্দীকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। রাজত্বকালের প্রথম দিকে পুর্ণিয়া আক্রমণের সময় সিরাজ জগৎশেঠেদের থেকে তিন কোটি টাকা চেয়ে বসেন। যখন মহাতাব রাই অর্থপ্রদানে অস্বীকার করেন, সিরাজ তাকে প্রকাশ্যে অপমান করেন। গোলাম হোসেন খান লিখেছেন ” জগৎ শেঠের মত বিশিষ্ট নাগরিককে সিরাজ সবার সামনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং বিদ্রুপ করতে শুরু করেন, এমনকি প্রায়ই খৎনা করে দেওয়ার হুমকি দিতেন”।

পলাশীর যুদ্ধের সময় আলীবর্দী খানের বিশ্বস্ত অমাত্য, সেনাপতিগণ এবং জগৎ শেঠ ভ্রাতৃদ্বয় কেন সিরাজের বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন গোলাম হোসেনের বিবরণ সেটা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। সিরাজউদ্দৌলা প্রকৃতপক্ষে ছিলেন বাংলায় নবাবী শাসন ধ্বংস করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকাল প্রতিষ্ঠিত করার অনুঘটক।

তথ্যসূত্র: দ্য অ্যানার্কি। উইলিয়াম ডালরিম্পল।

শিব রক্ষা অভিযান

-স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

আমার বাবা ছিলেন বেশ কড়া প্রকৃতির লোক। পুতুল খেলা, রান্নাবাটি খেলা যে একটা মেয়েলি বদভ্যাস, এ বিষয়ে বাবা অনড়। ফলে জন্মদিনে কারুর থেকে পুতুল উপহার পেলেই, সেগুলোকে হয় দান করে দেওয়া হত কিংবা দূরে কোথাও ফেলে আসা হত। ছোটবেলায় পুতুল হারানোটা খুবই কষ্টের ব্যাপার ছিল। কোন কিছু না পাওয়াটা একরকম আর পেয়ে হারানোটা আরেক রকম। বাড়ি ছেড়ে ফ্ল্যাটে আসার পর নতুন ঠাকুরের আসন প্রতিষ্ঠা হয়। আসনে রাখার জন্য একটি শিবলিঙ্গও কেনা হয়। এই শিব ঠাকুরটি ছিলেন আমার আপন জন। স্নান সেরে শুদ্ধ কাপড় পরে ঠাকুরের সামনে বসতাম। ঠাকুরের আসনের পর্দা খুলে শুরু হত নিত্য পুজো। তখন আমার অনেক কাজ। জল এনে চন্দন বাটা। শিব ঠাকুরকে ঘি মাখিয়ে চান করানো, গা মুছিয়ে চন্দন পরানো। ঠাকুরকে ফুল দিয়ে সাজানো, জল-বাতাসা দেওয়া। তারপর বাড়ির সবাইকে চরণামৃত আর প্রসাদি বাতাসা বিলি করা। আবার সন্ধ্যে বেলা সেসব বাসী ফুল তুলে, ধুপ-প্রদীপ দেখিয়ে, ঠাকুরের আসনের পর্দা বন্ধ করে দেওয়া। শিবকে নাইয়ে খাইয়ে, সাজিয়ে আমি পুতুল না পাবার কষ্ট, রান্নাবাটি না থাকার কষ্ট, সমস্ত ভুলে গিয়েছিলাম। ঠাকুর পুজো করতে করতে নিজেকে মনে হত শিবের সংসারের একটা ছোট্ট অংশ।

মুশকিল হল কদিন পরে। শিব ঠাকুরকে এত রগড়ে রগড়ে স্নান করানোর পর দেখা গেল পাথরের কালো রং সরে গিয়ে ধূসর রং বেরিয়ে পড়েছে। এটা সবার আগে চোখে পড়ল আমার বাবার। আহ্নিক সারতে গিয়ে শিবলিঙ্গ পরীক্ষা করেই বাবা নিশ্চিত হলেন যে এটা পাথরের শিবলিঙ্গ নয়, সিমেন্টের শিবলিঙ্গ। এ তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। বাবা সেদিনই বেরিয়ে পড়লেন খাঁটি পাথরের শিবলিঙ্গ খুঁজতে। পাওয়া গেলেই সিমেন্টের শিবকে জলে ভাসিয়ে পাথরের শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই পরিকল্পনা শুনে রীতিমত আঁতকে উঠলাম। কারণ এতদিনে সিমেন্টের ওই শিবলিঙ্গটির উপর বড্ড মায়া পড়ে গেছে। আমার সবকটা পুতুল কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কোন দুঃখ নেই কিন্তু শিব ঠাকুরটিকে আমার চাই। সিমেন্টের শিব যেহেতু অবাঞ্ছিত, অনাকাঙ্ক্ষিত, তাই ওই সিমেন্টের ঠাকুরটিকেই আমার সাক্ষাৎ ভোলা-বাবা বলে মনে হতে লাগল। ঠিক করলাম, পাথুরে শিবের হাত থেকে মর্ত্যের ভোলানাথটিকে আমাকেই রক্ষা করতে হবে।

দিন আসে, দিন যায়; আমি তক্কে তক্কে থাকি। ঠাকুরকে খুব নজরে নজরে রাখি। আমি জানতাম, আমার ঠাকুরের এখনো অতটা আশঙ্কা নেই। সেটা শুরু হবে পাথুরে শিবলিঙ্গের খোঁজ পাবার পর। তাই বাবা অফিস থেকে ফিরলেই উৎকণ্ঠায় সিঁটিয়ে থাকতাম। কে জানে, ফেরার পথে কোন খাঁটি পাথরের দোকান পড়ে কিনা। তবে একবার যেহেতু পাথর ভেবে সিমেন্ট কিনে ঠকেছেন, পরেরবার সত্যিকারের পাথর যাচাই করতে বাবারও খানিকটা সময় লাগবে। কিন্তু সেটা অনন্তকাল নয়। এদিকে ততদিনে আমার কালো শিব জলে ধুয়ে প্রায় সম্পূর্ণ ফর্সা হয়ে উঠেছেন। বাবাও মরিয়া।

একদিন এল সেই দুঃসংবাদ। বাড়ি ফিরেই বাবা ঘোষণা করলেন, খোঁজ পাওয়া গেছে। কালই আনা হবে তাঁকে। শিবরাত্রি তখন এক সপ্তাহ দূরে। শিবরাত্রির দিনই নতুন শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা হবে। সেদিন সবার প্রথমে বাবাই ঠাকুর পুজো করবেন। এমন সর্বনাশের খবর শুনে আমি বালিশ জড়িয়ে হু হু করে বেশ খানিকটা কেঁদে নিলাম। সকালে উঠে মনটাকে একটু শক্ত করলাম। কিছু একটা ভাবতে হবে। ভেবে ভেবে একটা বুদ্ধি বের করলাম। শিবরাত্রির সকালবেলা খুব ভোরে উঠে চুপিচুপি বাথরুমে গেলাম। বেরোলাম চান সেরে। গুছিয়ে ঠাকুর পুজো সেরে আসনের পর্দা বন্ধ করে উঠে পড়লাম।

বাবা উঠলেন অভ্যাস মত। আজই নতুন শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার দিন। নির্জলা উপোস রেখে স্নান সেরে ঠাকুরের পুজোয় বসতে হবে। পর্দা যেহেতু এঁটে বন্ধ করা, তাই বাবাও বুঝতে পারছেন না যে আজ সকালবেলাই ঠাকুরের আসনে এক দফা পুজো হয়ে গেছে। নতুন শিবলিঙ্গ হাতে ঠাকুরের আসনের পর্দাটা সরিয়েই বাবার চোখ কপালে উঠল। পুরোনো শিব ঠাকুর রাতারাতি লোপাট। ডাক ছেড়ে চেঁচাতে ইচ্ছে করলেও বাবা চেঁচাতে পারছেন না। ঠাকুর পুজোয় বসেছেন, এখন অন্য কথা বলা যাবে না। পুজো থেকে ওঠার পর বাড়ির উপর দিয়ে যে একটা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাবে, বেশ বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু বাবার তখনকার কিংকর্তব্য মুখটা দেখে বেশ একটা যুদ্ধজয়ের আনন্দ হচ্ছিল।

প্রায় দেড় ঘন্টা পর বাবা পুজো সেরে উঠলেন। চোখ লাল করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- “কি করেছ পুরোনো ঠাকুরকে”? আমি খুব নির্বিকার গলায় উত্তর দিলাম- “জলে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি।” কথাটা বাবার মোটেই বিশ্বাস হল না। গোটা দুপুর জুড়ে আমার সব জিনিস তোলপাড় করে খোঁজাখুঁজি হল। তাতেও মিলল না পুরোনো শিবলিঙ্গ। বিফল হয়ে বাকি দিনটা বাবা পুরো গুম হয়ে রইলেন। আমি ছিলাম বিকেলবেলার অপেক্ষায়। খেলতে যাবার জন্য বাবা প্রচুর জিন্সের প্যান্ট কিনে এনেছিলেন। খেলাধুলা করতে হলে নাকি ফ্রকের থেকে জিন্স ভাল। তবে ওই প্যান্ট গুলো পড়েই থাকত। ফ্রক পরেই খেলতে যেতাম। কারণ জিন্স বা প্যান্ট জাতীয় জিনিসকে লোকে তখনও “ছেলেদের জামা” বলত। আর মেয়ে হয়ে ছেলেদের জামা পরায় আমার গভীর আপত্তি ছিল।

সেই শিবরাত্রির দিনই আমার প্রথম জিন্স পরা। খেলার জন্য নয়, পকেটের জন্য। জিন্স গেঞ্জি পরে সেজেগুজে রান্নাঘরে গেলাম জল খেতে। বাবা তখনও পাশের ঘরে বসে একটার পর একটা বিড়ি খেয়ে চলেছেন। দৃষ্টি সামনের দিকে, মুখে একটা রাগী রাগী ভাব। আমি খুব সন্তর্পণে ফিল্টারের ঢাকনা খুলে ভিতরে হাত ঢুকালাম। কিছুক্ষণ হাতড়াতেই বেরিয়ে এল সযত্নে লুকিয়ে রাখা পুরোনো শিব ঠাকুর। বাবাকে আমি মিথ্যে বলিনি, শিব ঠাকুরকে আমি জলেই বিসর্জন দিয়েছিলাম। তবে সেটা ফিল্টারের জলে। শিব ঠাকুরকে পকেটে নিয়ে বাবার সামনে দিয়ে বেরোনোর সময় বুকের ভেতরটা ঢিব ঢিব করছিল। এই বুঝি গেল সব ফাঁস হয়ে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আজকে আর বন্ধুদের সাথে খেলা নয়। এখন গন্তব্য পাড়ার শিব মন্দির। ঐখানেই রেখে আসব আমার পুরনো শিব ঠাকুরকে। সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরে মায়ের সাথে বেরোনো আছে। যাব পাড়ার ওই শিব মন্দিরেই। শিবের মাথায় জল ঢালতে। মন্দিরের বড় শিব আর আমার ছোট শিব পাশাপাশি থাকবেন, একসাথে পুজো পাবেন। বাবার সংসারে নতুন শিব আসুক, পাড়ার মন্দিরটাই আমার শিবের সংসার।

ভাষা, জাতি এবং আরবের কালো ছায়া

-স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

ভাষা মানে শুধু কিছু শব্দের যোগফল নয়। ভাষা একটা স্বতন্ত্র এবং নির্দিষ্ট সংস্কৃতির প্রকাশ। সংস্কৃতি পাল্টে গেলে ভাষাও রূপ পাল্টায়, ভাষার পরিচয় পাল্টায়। ১৪০০ বছরের কিছু আগে আরব দেশটা ছিল বহুত্ববাদী। হিন্দু সংস্কৃতির অনুরূপ ছিল সেই সংস্কৃতি। কাবা-র মন্দিরে ছিল প্রায় ৩৬০ জন দেব-দেবীর মূর্তি। ছিলেন দেবী লাত-মানত-উজ্জা, সসম্ভ্রমে পূজা পেতেন হুবাল দেব। তখন আরবের ভাষা শুনে কেউই সেটাকে “ইসলামী ভাষা” বলে মনে করত না। কারণ ইসলাম ধর্মের তখনো জন্মই হয়নি। তাই আরবি ভাষার পরিচয় সেই যুগে ছিল “মূর্তি পূজারী জাতির ভাষা”। আর আজ? ইসলামের প্রভাবে দেশটার পরিচয় এখন এতটাই বদলে গেছে যে এখন কারও মুখে আরবি ভাষা শুনলেই তাকে আমরা মুসলমান বলে ধরে নিই। ভাষা কিন্তু বদলায়নি, আগেও “আরবি ভাষা” ছিল, এখনো “আরবি ভাষা”ই আছে। শুধু ওদের ধর্মটা বদলেছে আর তাতেই পাল্টে গেছে ভাষার চরিত্র এবং পরিচয়।

হুবহু একই ব্যাপার ঘটেছে মিশরে। মিশর হল অত্যন্ত প্রাচীন সভ্যতার জন্মভূমি। এই দেশটাও একসময় ছিল বহু ঈশ্বর-এর দেশ। নানান দেবদেবীর মূর্তি পূজাই ছিল এই দেশের প্রধান ধর্ম। তখনই সাহিত্য, স্থাপত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির চূড়ায় উঠেছিল সে দেশ। তারপর মিশরকে ছারখার করতে ধেয়ে এল সভ্যতার অন্যতম পাপ, আরব সাম্রাজ্যবাদ। দখল হয়ে গেল মিশর। আরব সাম্রাজ্যবাদীরা প্রথমেই চাপিয়ে দিল ইসলাম ধর্ম। তারপর বদলে দিল দেশের নাম। মিশরের আদি নাম ছিল “হুট কপ্টা”, সেই নাম পাল্টে আরবি ভাষায় নতুন নাম রাখা হল “মিশর”! এই আরবি নাম আজকে এত পরিচিতি পেয়েছে যে বাংলাতেও আমরা একে “মিশর” বলেই চিনি। মাটির নাম পাল্টে যাওয়া মানেই জাতীয় পরিচয় হাতছাড়া হওয়া। ফলে বাইরে থেকে মিশরে আসা আরবরা হয়ে গেল “মিশরীয়” আর প্রাচীন মিশরীয়রা হয়ে গেল “কপ্ট”! যে মিশরের আদি নাম ছিল “হুট কপ্টা”, নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে সেই দেশের আসল উত্তরাধিকারী হল এই কপ্ট-রা। অথচ দেশের নাম পাল্টে মিশর রাখার ফলে মিশর কথাটার সাথে কপ্ট কথাটার আর কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনে হবে “মিশর” আর “কপ্ট” কথা দুটো এতটাই আলাদা, যেন এই দুটোর একে অপরের সাথে কোন সম্পর্কই নেই। বহিরাগত আরবরা এর পরে পরেই মিশরের আদি কপ্টিক ভাষার লিপি পাল্টে দিল, চাপিয়ে দিল আরবি লিপি। ধীরে ধীরে কপ্টিক ভাষাটাকেই সরিয়ে দিয়ে গোটা দেশে প্রতিষ্ঠিত হল আরবি ভাষা। আজও মিশরের রাষ্ট্রভাষা আরবি, ওদের জাতীয় সংগীত আরবিতে লেখা, জাতীয় লিপি আরবি। “হুট কপ্টা” যেদিন থেকে আরবি নাম “মিশর” হল, সেদিন থেকেই কপ্ট ভাষা এবং জাতির দুর্ভাগ্যের সূচনা। আজ কপ্ট জাতি নিজেদের দেশ “হুট কপ্টা”-তে অত্যাচারিত, অবহেলিত। গোটা বিশ্ব সেই কান্না শুনছে না, বুঝছে না। বুঝবে কি করে? দেশের নাম পাল্টে মিশর হবার পর, পৃথিবীর কেউ বুঝতেই তো পারছে না কপ্ট-রাই মিশর-এর আসল উত্তরাধিকারী। এইখানেই দেশ এবং জাতি রক্ষায় ভাষার গুরুত্ব।

ঠিক এই একই চাল চালা হয়েছে কাশ্মীরে। কাশ্মীর ঋষি কশ্যপ-এর দেশ, কাশ্মিরী বলতে আদিতে হিন্দুই বোঝাত। সেখানে যখন আরবি হানাদারেরা এল এবং ইসলাম চাপিয়ে দিল, ধীরে ধীরে কাশ্মীরের জনবিন্যাস বদলাতে শুরু করল। বদলাতে বদলাতে আজ এমন অবস্থা হয়েছে, “কাশ্মিরী” বলতেই এখন মুসলমান বোঝায়। “কাশ্মিরী শালওয়ালা” শুনলেই আমরা ফর্সা চেহারার এক মুসলমান পুরুষকে কল্পনা করে নিই। আদি কাশ্মিরী অর্থাৎ কাশ্মিরী হিন্দুদেরকেই এখন নিজেদের আলাদা দেখাতে “কাশ্মিরী পন্ডিত” লিখতে হয়। অর্থাৎ আজকাল “কাশ্মিরী” মানে শুধুমাত্র কাশ্মীরের মুসলমান; আর আদি কাশ্মীরীদের লিখতে হয় “কাশ্মিরী পন্ডিত”। অথচ এটা ঠিক উল্টোটাই হবার কথা ছিল। যারা আগে থেকেই কাশ্মীরে ছিলেন, তারা নিজেদের জাতি পরিচয়টার অব্দি অধিকার খুইয়েছেন আর যারা পরে এল এবং বহিরাগত-দের সংমিশ্রনে সৃষ্টি হল, তারা “কাশ্মিরী” জাতিপরিচয়টা পুরোপুরি দখল করে বসেছে। শুধু তাইই নয়, কাশ্মিরী ভাষা লেখার নিজস্ব লিপি ছিল, যার নাম শারদা লিপি। সেই লিপি তুলে দিয়ে কাশ্মীরের মুসলিমরা কাশ্মিরী লেখেন আরবী বর্ণমালায়। এমন কি ৩৭০ ধারা ওঠার আগে পর্যন্ত জম্মু কাশ্মীরের রাজ্য ভাষা ছিল আরবি লিপিতে লিখিত উর্দু। তবুও শেখ আব্দুল্লা, মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দরাই নাকি আসল “কাশ্মিরী”, যাদের নামে একটাও কাশ্মিরী শব্দ নেই। আর টিকা লাল টাপলু, গিরিজা টিকু ইত্যাদিরা শুধুই “কাশ্মিরী পন্ডিত”! অথচ টিকু, টাপলু, গন্জু ইত্যাদি পদবী শুনলেই বোঝা যায় যে এগুলো কাশ্মীরের পদবী; শেখ-সৈয়দ পদবী কাশ্মীরের মুসলমানের নাকি পারস্যের মুসলমানের, এটা বোঝার কোন রাস্তা নেই। বিজাতীয়রা যখন ভাষার দখল নেয়, জাতি-পরিচয়টাকেও এভাবেই কেড়ে নেয়।

বাংলা ভাষা রক্ষার দরকারটা ঠিক এই রকম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আটকাতে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ কিন্তু আমাদের ভাষাটা নিয়ে যাচ্ছেতাই করা শুরু করে দিয়েছে। বাংলা ভাষার যথেচ্ছ আরবী করণ করা হয়েছে। দিদি-কে আপা, মাসিকে খালা, পিসিকে ফুফা, মাংসকে গোশত, স্বর্গকে বেহেশত… এই তালিকা শেষ হবার নয়। বাংলা ভাষায় প্রায় ২৫-৩০% আরবি শব্দ যোগ করেছে ওই দেশটা। বাংলা ভাষায় শব্দ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে সেগুলোর আরবি প্রতিশব্দ দেওয়া হয়েছে। এবং এতখানি ভাষা বিকৃতি ঘটানোর পরেও পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশকেই “বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক” ভেবে ধন্য ধন্য করছেন। প্রকৃত বাঙালি নাকি বাংলাভাষী মুসলিমরাই! এদের ধৃষ্টতা আমার চিন্তা ও চেতনাকে বিদ্রোহী করে তোলে। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে, যখন চর্যাপদে লেখা হয়- “আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলি”, অর্থাৎ “আজ থেকে ভুসুকু বাঙালি হয়ে গেল”, তখন বাংলায় মুসলমান কোথায় ছিল? মহাভারতে যে বঙ্গ রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে, প্রাচীন চৈনিক সাহিত্যে বঙ্গ রাজ্যের অধিবাসীদের “বং” বলা হয়েছে, কখনো লেখা হয়েছে “বং লি”! এতেও কি বোঝা যাচ্ছে না যে ইসলাম আসার বহু আগে থেকেই “বাঙালি” নামক একটা জাতির অস্তিত্ব ছিল। তাহলে বাংলাভাষী মুসলিমরা কিভাবে “প্রকৃত বাঙালি” হয়? বাংলা ভাষার জন্য বাংলাভাষী মুসলমানদের অবদানটা ঠিক কি? ভাষার মধ্যে গাদা গাদা আরবি শব্দ ঢোকানো? ঢুকিয়ে ভাষাটার চরিত্রই পাল্টে দেওয়া? এই মুসলমানরা যদি এতটাই বাংলা ভাষাপ্রেমী হবে, তাহলে আরবি শব্দ ঢোকানোর জন্য এত আকুলতা কেন? ইতালীয় বা ফরাসি শব্দ কেন নয়? তাছাড়া একটা ভাষাতে অন্য ভাষার এত শব্দ ঢোকাতে হবেই বা কেন? বাংলাতে “মাংস” নামক শব্দটা থাকতেও যখন কেউ “গোশত” বলে, “নরক” থাকতেও “জাহান্নাম” বলে; তখন এই ধরণের আচরণ তাদের বাংলাপ্রেম নির্দেশ করে না, আরবি প্রেম নির্দেশ করে। তাই এরা ঠিক ততটাই বিজাতীয় এবং ততটাই অবাঙালি যতটা গুজরাটি-মারওয়ারী-বিহারীরা। ওদের ভাষাপ্রেম আসলে ভাষা-দখল এবং জাতি-দখলের অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

ভাষা দখলের সাথে জাতি দখলের সুস্পষ্ট সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কটা বাঙালিকে খুব পরিষ্কার ভাবে বুঝতে হবে। প্রথম ধাপে বাংলার মধ্যে গুচ্ছ আরবি ঢুকিয়ে ওদের বাংলা আর আমাদের বাংলা-কে আলাদা করা হবে। এতে এক ঢিলে দুটো পাখি মারা যায়। প্রথমতঃ ওরা আর আমরায় ভাগ তৈরি হল আর দ্বিতীয়তঃ ওদের হাতেও বাংলা ভাষার অর্ধেক অধিকার চলে যাওয়া। আরবি মেশানো বাংলাটা যখন ওদের বাংলা, তখন সেই বাংলাটাকে নিয়ে ওরা ইচ্ছেমত কাটাছেঁড়া করতেই পারে।

এবার দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয়েছে, ভাষার উপর ভিত্তি করে জাতি পরিচয় গুলিয়ে দেবার চেষ্টা। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় ভর দিয়ে চেষ্টা হচ্ছে “বাঙালি” পরিচয়টাই কেড়ে নেবার। যারা বহিরাগত বখতিয়ার খলজি, শাহ জালাল, হুসেন শা, সিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে গর্ববোধ করে, তারাই নাকি বাঙালি। আর যারা এই বহিরাগতদের খলনায়ক বলে, তারা হয়ে গেল গোঁড়া সাম্প্রদায়িক। জাতি দখল আসলে মাটি দখলের পূর্বসূরী। জাতি পরিচয় দখল হয়ে গেলে মাটি দখলটা অনেক সোজা হয়ে যায়। ভেবে দেখুন তো, বাংলাদেশে কি হচ্ছে। ওখানে মুসলিমরা হয়ে গেছে “বাঙালি” আর যারা সত্যিকারের বাঙালি, তারা হয়ে গেছে “হিন্দু”! অর্থাৎ “বাংলাদেশে বাঙালিরা হিন্দু নির্যাতন করে”! কথাটার তাৎপর্য বুঝতে পারছেন? বাংলাদেশ আর বাঙালি, এই কথা দুটোয় অনেক মিল আছে। কিন্তু বাংলাদেশ এর হিন্দু, এই শব্দ দুটোয় কোন মিল নেই। অতএব, “বাঙালি” জাতিপরিচয়টা যদি মুসলিমরা পুরোপুরি দখল করে নেয়, পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের মেরে তাড়িয়ে দিলেও গোটা পৃথিবীর কোন সহানুভূতিই আমরা পাব না। গোটা পৃথিবী ভাববে “বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ তো বাঙালিদেরই। তাহলে এই হিন্দু নামক লোকগুলোই নিশ্চয় বহিরাগত। বাঙালিরা হিন্দুদের মেরে তাড়ানোটা তার মানে ভুমিপুত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা।”

ঠিক এই ব্যাপারটাই কাশ্মীরে ঘটেছিল। “কাশ্মিরী” মানেই যেহেতু হয়ে গেছিল মুসলিম, সারা বিশ্ব ধরেই নিয়েছিল “কাশ্মীর তো কাশ্মিরী থুড়ি মুস্লিমদেরই অধিকার”! এই জট এখনো খোলা যায়নি। বাঙালি পরিচয়টা নিয়েও এই একই জট পাকানোর চেষ্টা চলছে। এর অন্যতম অস্ত্র হল “একুশে ফেব্রুয়ারি”! ভাষার নামে প্রকৃত বাঙালিদেরকে বাংলাদেশি মুসলমানের দাসে পরিণত করাটাই এর লক্ষ্য। যেন আমরা মেনে নিই বাংলাদেশী-দের প্রভুত্ব, বাঙালি জাতিসত্ত্বা ছেড়ে দিই ওদের হাতে। “বাঙালি” শুনলে গোটা পৃথিবী যেন ভাবে জোব্বা পরা গোঁফ হীন কোন দাঁড়িয়াল চাচাকে। সেজন্যই আজকের দিনটা পালন করা এত জরুরী। না, “ভাষা দিবস” হিসেবে নয়, “আরব সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দিবস” হিসেবে।

ঠুকে বলো বুকের ছাতি,
সবার উপর ধর্ম-জাতি।
আমার ভাষা, আমার মা,
আরবিকরণ মানব না।

মহাভারতের কাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বাঙালি জাতি একটাই। চৈনিক পুঁথি থেকে চর্যাপদ হয়ে শ্রীলঙ্কার মহাবংশম পর্যন্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে বাঙালি বলতে আসলে কারা। ইসলাম আসার অনেক আগে থাকতেই ছিল যারা। ইতিহাস আমাদের সাথেই আছে, দরকার শুধু সেটাকে প্রতিষ্ঠা করা। আমরা “বাঙালি হিন্দু” নই, আমরাই বাঙালি এবং আমরা ছাড়া অন্য কিচ্ছু বাঙালি নয়। এই কথাটা এত জোর গলায় বলতে হবে যেন বিশ কোটি বাংলাভাষী মুসলমানের কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায়। এখনো আমরা সংখ্যায় দশ কোটি আছি। দশ কোটির উজ্জ্বল ভবিষ্যতে জন্য বাংলা ভাষাটাকে বাঁচান, বাঙালি জাতিটাকে বাঁচান। আরবি সাম্রাজ্যের হাতে বাংলা দখল আটকান। জয় মা কালী, জয় বাঙালি।

একুশের ধোঁকা

-স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

পাকিস্তান যখন পূর্ব আর পশ্চিমে বিভক্ত, পূর্ব দিকে বাঙালি ছিল মাত্র ২২%, বাকি সব মুসলমান। উর্দু ভাষা যখন চাপানো শুরু হয়, সবার আগে গর্জে ওঠেন শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। উর্দু ভাষীরা যে ৩২ লাখ বাংলাভাষীকে খুন করেছিল, তার মধ্যে ২৭ লক্ষ ছিল বাঙালি। মাত্র ৫ লাখ বাংলাভাষী মুসলিম। যে অজস্র নারীকে সেনা আর রাজাকার মিলে ধর্ষণ করে, সেই ধর্ষিতাদেরও অধিকাংশ ছিল বাঙালি। আজ্ঞে হ্যাঁ, পশ্চিম পাকিস্তানিরাও জানত বাঙালি মানেই হিন্দু। মুসলমান কখনো বাঙালি হয় না, বড়জোর বাংলাভাষী হতে পারে।

২১ শে ফেব্রুয়ারি আসলে “ধোঁকা দিবস”! এই দিনেই বাঙালির কাছ থেকে বাংলা ভাষার নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয় বাংলাভাষী মুসলিমরা। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু চাপানোর বিরুদ্ধে লড়ল বাঙালি, খানসেনাদের হাতে লাখে লাখে মরল বাঙালি; অথচ ভাষা-শহীদের মর্যাদা পেল শুধু মুসলিমরা। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবার পর সম্পুর্ন ক্ষমতা দখল করল বাংলাভাষী মুসলিমরা। ২২% মানুষ দেশ স্বাধীন করতে রক্ত দিল ৯০%, অথচ ক্ষমতার ভাগ পেল ০%; এটা ধোঁকা ছাড়া আর কি?

কিন্তু এখনো কিছু নির্লজ্জের দল “একুশের চেতনা”-র নামে বাঙালিদের আরো একবার ধোঁকা দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। “একুশে ফেব্রুয়ারি” আসলে জন্ম থেকেই মৃত। যেদিন ঢাকার রমনা কালীবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল, সেদিন “একুশের চেতনা” কোথায় ছিল? পশ্চিম পাকিস্তানিরা উর্দু-ভাষী, তারা না হয় বাঙালি-দের “শত্রু” বলে মনে করত। তাই তারা বাঙালিদের স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তির উপর মুসলিম জবর-দখলকে বৈধতা দিতে একটি আইন এনেছিল। তার নাম- “শত্রু সম্পত্তি আইন”! বর্বরদের কাছ থেকে তো বর্বরতাই প্রত্যাশিত। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হবার পর যখন শেখ মুজিবর রহমানও যখন ওই একই আইন বহাল রাখলেন, এবং ধ্বংস করে দেওয়া রমনা কালিবাড়ির জমি কিছুই ফেরত দিলেন না; সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ মোটেই “বাঙালির দেশ” নয়। ওটা আসলে বাংলাভাষী মুসলমানের দেশ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম যখন ইসলাম ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশী সংবিধানের মাথায় লেখা হল “বিসমিল্লা রহমানি রহিম” অর্থাৎ “শুরু করছি পরম করুণাময় আল্লার নামে”, তখন এই ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক “একুশের চেতনা” কোথায় লুকিয়ে ছিল? নাকি বাঙালিদের সাথে বারবার ধোঁকাবাজি করার জন্যই “একুশের চেতনা” নিয়ে আদিখ্যেতা করার দরকার পড়ে?

তাই যতই বাংলাভাষী মুসলমানকে বাঙালির সাথে জুড়ে দেবার চেষ্টা হোক না কেন, আমাদের প্রতিজ্ঞা অটুট থাকবে। আমরা আমাদের জাতিসত্ত্বা ফেরত চাই। আমরাই আদি বাঙালি, বাঙালি জাতির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরাই এই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। যারা আমাদের জাতি পরিচয় চুরি করার চেষ্টা করছে, তারা আসলে দখলদার। অবিভক্ত বাংলার ৬৭% মাটি ওরা দখল করে রেখেছে স্রেফ গায়ের জোরে। এই দখল অবৈধ। এপার থেকে ওপার, সমগ্র বাংলাই বাঙালির মাটি। জাতির নাম চুরি করে যারা মাটি দখলকে বৈধতা দিতে চায়, তাদের বিচার হবে এই বাংলার মাটিতে। ফেব্রুয়ারি একটা ধোঁকার মাস। এই মাসে যত্ন করে বাঙালি পরিচয়কে গুলিয়ে ঘেঁটে ঘন্ট পাকানো হয়। যারা বাংলাভাষী মুসলমানকে বাঙালি বলে, তারা ইসলামের দাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই একুশের নামে ধোঁকা আর নয়। বাঙালি সেদিনই আবার “একুশে” পালন করবে যেদিন তার আত্মবলিদানকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়া হবে। তার লুঠ হওয়া ৬৭% মাটির অধিকার সে আবার ফিরে পাবে। তার আগে পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি “ভাষা দিবস” নয়, “ধোঁকা দিবস”!

#একুশের_ধোঁকা

অলীক কুনাট্যরঙ্গে এদেশের কম্যুনিস্টি

~ সাত্যকি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাশিয়ার চিঠি’  তে রাশিয়ায় স্তালিনের জবরদস্তিমূলক শাসনব্যবস্থার কঠিন সমালোচনা করিয়াছিলেন| কিন্তু কম্যুনিস্ট নেতাগণ সেকথা এতদ্দেশীয় জনগণের সামনে কিছুতেই প্রকাশ করেন না| তাহারা শুধু রাশিয়াতে কবির মুগ্ধ অভিজ্ঞতার অংশটুকুকেই বারংবার প্রচার করিয়া থাকেন| এই ভণিতার কি এবং কেন অতঃপর বলিব|বেশ কিছু বৎসর ধরিয়া আমরা দিল্লীর JNU বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের দ্বারা অলীক কুনাট্যরঙ্গ সম্পাদন হইতে দেখিতেছি| উহারা সকলেই CPIM , CPI , CPIML, MAOISM প্রভৃতি  কম্যুনিস্ট দর্শনে ঋদ্ধ| এখন ,একজন কম্যুনিস্ট ধর্মে দীক্ষিত মানুষ তাহার মন হইতে কখনোই “লিবারাল” হইতে পারে না , একথা অই ধর্ম সম্পর্কে বিন্দুমাত্র পড়াশোনা যিনি করিয়াছেন তিনিই জানেন| তবু তেঁনারা কেন যে অর্হনিশ গণতন্ত্রের দোহাই পারেন  তাহা জানি না, কারণ পৃথিবীর কোনো কম্যুনিস্ট দেশেই গণতন্ত্রের বালাই নাই| পার্শ্ববর্তী দেশ চিন তাহার জ্বলন্ত উদাহরণ| আজও সেখানে কোনো বিরোধী কন্ঠস্বরের টুঁ শব্দ করিবার অধিকার নাই| ১৯৮৯ সালে তথায় তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে গণতন্ত্রের দাবীতে আন্দোলনরত ছাত্রসমাজের উপর তথাকার কম্যুনিষ্ট সরকার ট্যাঙ্কদ্বারা গোলা দাগিয়া দশহাজার ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করিয়াছিল| বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী এই ঘটনায় আহত, পঙ্গু, নিখোঁজ হইয়া যায় , আজও তাহার প্রকৃত সংখ্যা অজ্ঞাত রহিয়াছে|এদেশে তো কস্মিনকালেও কম্যুনিস্টদের উপর এই জাতীয় বলপ্রয়োগ করা হয় নাই| বিচারব্যবস্থার নামে চীনে চিরকালই রীতিমত প্রহসন হইয়া থাকে| লঘু পাপে দুষ্ট অপরাধীকেও নামমাত্র বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া কোনরূপ মানবাধিকারের পড়োয়া না করিয়া যত দ্রুত সম্ভব, ফায়ারিং স্কোয়াডের সম্মুখে দাঁড় করাইয়া হত্যা করা হয়| আর এদেশে সন্ত্রাসবাদী ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি রোধ করিতে ,সুদীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কালক্ষেপণের পরেও দণ্ডপ্রদানের ঠিক পূর্ব দিবসে মধ্যরাত্রিতে, সমুদয় পূর্বের রীতিনিয়মকে কলা প্রদর্শন করিয়া কম্যুনিষ্ট লিবারেলদের চাপে  সুপ্রীম কোর্ট খোলানো হয় গোটা বিচার-প্রক্রিয়ার রিভিউ করাইতে, শুধুমাত্র ইসলামিক মৌলবাদিদের সন্তুষ্ট করিতে| আমার প্রশ্ন, এদেশের দেশদ্রোহী কম্যুনিষ্টদের জন্য কি বিচারব্যবস্থার চৈনিক বিধান প্রয়োগ করাই যথার্থ ছিলো?  যদি না হইয়া থাকে, তাহা হইলে এই দেশের কম্যুনিষ্টরা এদেশের গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার প্রতি এত রুষ্ট কেন? কোন জাতীয় গণরাষ্ট্রের স্বপ্ন ইহারা ফেরি করিয়া বেড়ান? উহারা প্রকৃতপক্ষে কি জাতীয় গণতন্ত্রের দাবি করিয়া থাকেন?

এককথায় ইহার উত্তর – নৈরাজ্যবাদীর গণতন্ত্র , মানে গণতন্ত্রের খাইব পড়িব ,অধিকার আস্ফালন করিব, মিথ্যা প্রচার যন্ত্রের কুশল কারসাজিতে জনমনকে ভুল বুঝাইবো, অবশেষে নিজের রামরাজত্ম কায়েম হইবামাত্র সেই গণতান্ত্রিক আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়া দেশকে লুম্পেন ও স্বৈরাতন্ত্রের কারখানা বানাইয়া তবে ক্ষান্ত হইব| সেখানে অধিকার থাকিবে মুষ্টিমেয় কিছু দম্ভী উন্মাদ নেতার, যাহারা সদা সর্বদা ভোগ সুখ লালসায় প্রমত্ত থাকিয়া দেশের সম্পদ লুন্ঠন করিয়া তাহাদিগের বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষগণকে বন্টন করিয়া দিবেন| ইহারা ভারতবর্ষের সনাতন ধর্ম, সংস্কৃতি,কৃষ্টির আদ্যশ্রাদ্ধ দিবারাত্র করিতে থাকিবেন, ইসলামিক মোল্লাতন্ত্রকে প্রশ্রয় দিয়া হিন্দু জনগণের বিরুদ্ধে অহর্নিশ  প্ররোচিত করিতে থাকিবেন এবং চূড়ান্ত খুন ধর্ষণ রাহাজানির নৈরাজ্য স্থাপন করিয়া মানুষকে এক অলীক স্বপ্নের সমাজ গড়িয়া দিবার লোভ দেখাইয়া নিজেরা আগে হইতেই সেই অলীক কল্পরাজ্যের  ভগবান হইয়া বসিবেন |বাঙালি হিন্দু জনগণ বিস্মৃত হইবেন কি করিয়া, এই কম্যুনিষ্টগণ (পড়ুন সি. পি.আই.এম )বিগত ৩০ শে এপ্রিল ১৯৮২ তারিখে কলিকাতার সন্নিকটে বিজনসেতুতে ষোলজন হিন্দু সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসীনিকে অগ্নিদহনে হত্যা করিয়াছিল যে জঘন্য অপরাধের আজও কোনো বিচার  হইলো না !

সত্য বলিতে কি,একজন কম্যুনিস্ট এবং একজন অর্ধবর্বরের মধ্যে কোনোপ্রকার পার্থক্য আমি অন্তত খুঁজে পাইনা| এব্যাপারে আমি উহাদেরকে ইওরোপ লুন্ঠনকারি হূন অধিপতি অ্যাটিলার সৈনিকদের সহিত তুলনা করিতে পারি| আজ হইতে প্রায় পনেরশো সত্তর বৎসর পূর্বে যে অঞ্চল দিয়া উহারা বিচরণ করিয়াছিল তাহা শ্মশানভূমিতে পরিণত হইয়াছিলো| গোটা ইওরোপ আতঙ্কে নিদ্রা ভুলিয়াছিলো| তাই ইতিহাস উহাদিগকে ” বিধাতার অভিশাপ ” নামে আজও মনে রাখিয়াছে | কিন্তু কম্যুনিস্টরা ইহাদের তুলনায়  আরও মারাত্মক এই কারণে যে ইহারা কমবেশি শিক্ষিত| এই শিক্ষা যথার্থরূপে কুশিক্ষা সন্দেহ নাই, তথাপি তাহা শিক্ষা এবং তাহারও আবার বড়াই কত ! সেইকারণে ভারতবর্ষের দেশীয় জাতি- ধর্ম -সমাজ-পরিবারের জন্য ইহারা অত্যন্ত দুষ্ট ব্যাকটেরিয়াস্বরূপ , কোনো সন্দেহ নাই|  এই গ্রহের যে যে অংশে উহারা রাজত্ব করিয়াছে, তথাকার ধর্ম, শিল্প, কৃষ্টি, সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছে | ধর্মকে উহারা আফিমের ন্যায় মাদক মনে করিয়া থাকেন | মহানবী হজরত মহম্মদ বলিয়াছিলেন, ” একজন শিক্ষিত মানুষ যদি শয়তান হয় তাহা হইলে তাহার চেয়ে মন্দ কিছু হইতে পারে না | ” কম্যুনিস্টদের স্বপক্ষে এই বাক্য অনায়াসে বলা চলে |

জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ইহারা জবরদস্তি এবং মিথ্যা প্রচারকে হাতিয়ার করিয়া দেশীয় সমাজকে কলুষিত করিয়া থাকেন| ইতরতা উহাদের মস্তক হইতে পদযুগল অবধি ঢাকিয়া না দিলে উহারা কম্যুনিস্ট সার্টিফিকেট প্রাপ্ত হন না | আর এই সার্টিফিকেট প্রাপ্ত না হইলে  তো    ”    ঐশি  ঘোষ   ”   হওয়া যায় না !! পাঠকগণ কি বলেন ? বিগত দিবসগুলিতে এই  ঐশি ঘোষের নেতৃত্বে দিল্লীর JNU বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যে মাস্তানি, গুণ্ডামি,অরাজকতা, পড়াশোনা বন্ধ, দেশদ্রোহী মিছিল, ছাত্রছাত্রীগণকে পরীক্ষার ফর্ম পূরণে বাধা দান এবং সেই উদ্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার – সার্ভার বিনষ্ট করা প্রভৃতি কি না ঘটনা ঘটিয়াছে ? অথচ যেইমাত্র ঘটনাসমূহের বিপরীত প্রতিক্রিয়ায়  কিঞ্চিত রক্তক্ষরণ (যদিও তা কাম্য ছিল না ) ঘটিল, কম্যুনিস্ট দালালগণ দেশে বিদেশে ভারত সরকার বিরোধী এবং হিন্দু জনসাধারণ বিরোধী প্রচারে ‘রে রে’ করিয়া নামিয়া পড়িলেন |যে ঐশি ঘোষ প্রেস মিডিয়ার সম্মুখে নিজের কপাল দেখাইয়া ” ইধারসে ফাড় দিয়া, উধারসে ফাড় দিয়া , আঠারোটি হাকিমি সেলাইয়ের ” কাহিনী শতমুখে কহিতেছিলেন, ঠিক পরদিন দেখা গেল তাহার কপালে একটি মামুলি ছোট্ট ব্যান্ডেড মাত্র লাগানো রহিয়াছে | তাহার দক্ষিণ হস্তের কনুই অবধি আচ্ছাদিত প্লাস্টার ব্যান্ডেজ উধাও হইয়া বাম হস্তের আচ্ছাদন হইল|ইহাদের কয়েকটি দালাল-মিডিয়া এবং তাহাদের সঞ্চালকবৃন্দ বরকা দত্ত, রাবিশকুমার প্রমুখেরা প্রাণপণে এই মিথ্যা প্রচারে  সহায়তা করিতে থাকিলেন| কয়েকটি অর্ধশিক্ষিত বুদ্ধিজীবি যাহারা বুদ্ধি করিয়া করিয়া  জীবনভোর  এই দেশটাকে হরিৎবর্ণ কামধেনুর ন্যায় দোহন করিয়া চলিতেছিলেন তাহারা নিন্দায় মুখর হইলেন| এক মিথ্যা সহস্রবার উচ্চারণ করিয়া তাহাকে সত্যে সমাহিত করিবার চিরকালীন ব্যজস্তুতি চলিতেই লাগিলো | আমরা আহা , উহুঁ ..করিয়া উঠিলাম| আজন্মকাল কম্যুনিস্টগণের এই শয়তানি দেখিয়া আসিতেছি ,আরো কত দেখিবো সন্দেহ নাই |

আজন্মকাল দেখিতেছি অন্যের দিকে অঙ্গুলি উঠাইয়া উহাদের শ্বাশত অনৃতবাণী  “মোরা কম্যুনিষ্টো, উহারা কম নিষ্ঠ|” দিবারাত্র হিন্দুজাতির আদ্যশ্রাদ্ধ করিতে ইহারা ভুল করেন না| দেশদ্রোহী আফজল গুরুকে ফাঁসি দিলে এঁনারা “শরমিন্দা” হন| উমর খালিদ,কানহাইয়া কুমারের মতো দেশবিরোধী তথাকথিত দুষ্ট ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে তেনারানাড়া বাহির করেন “ভারত তেরে টুকড়ে হোঙ্গে,ইনশাল্লা ইনশাল্লা “| হিন্দু ভারতবর্ষ ইহাদের রক্তের জ্বালা, হৃদয়ের দহন|  সৌভাগ্য এই, ভারতবর্ষের  জনসাধারণ ইহাদেরকে প্রায়- পরিত্যাগ করিয়াছেন| দেশের দু -একটি সীমিত অংশ ব্যতীত ইহাদেরকে দূরবীন দ্বারাও আর দেখা যায় না|তথাপি বর্বরদিগের কিঞ্চিত শরমবোধ নাই| উহাদের নেতা অশোক মিত্র মহাশয় বলিতেন যে তিনি ” ভদ্দরলোক নন,কমিউনিষ্ট”| আমরাও বিলক্ষণ তাহা জানি এবং ভালো কিছু উহাদের নিকট হইতে প্রত্যাশাও করিনা| এই ভারতবর্ষ -বিদ্বেষী বর্বর নগ্ন -কুলপতিগণের জীবন দর্শনের নির্বকল্প সমাধিই কাম্য

পশ্চিমবঙ্গের জন্ম, মার্ক্সবাদী এবং একজন অতুল্য ঘোষ

অতুল্য ঘোষের নাম শুনেছেন তো? তিনি ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা, লোকসভার প্রাক্তন সদস্য। এছাড়া তিনি ছিলেন “নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা। উক্ত সংগঠনটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের জন্য আন্দোলন করে। বাংলা ভাগের সীমারেখা কী হবে, তাই নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষ থেকে যে চারটি প্রস্তাব জমা পড়ে, তার মধ্যে একটি প্রস্তাব দেয় এই নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পরেও এই সংগঠনটি বাঙ্গালী হিন্দু অধ্যুষিত তৎকালীন বিহারের মানভূম জেলা ও অসমের গোয়ালপাড়া জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আন্দোলন করে। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থরক্ষায় অতুল্য ঘোষের অবদান অনস্বীকার্য।

এইবার স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান আলোচনা করা যাক। ১৯৪২-এ “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের সময় তাঁকে গ্রেফতার করে পাঠানো হয় মেদিনীপুর জেলে। জেলের ভেতরেই এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। ফলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। লাঠিচার্জের সময়ে, পি.কিড নামে এক ইংরেজ অফিসার তাঁর হাতের লাঠি অতুল্য ঘোষের চোখে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে আজীবনের জন্যে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
এছাড়া সেইসময়ই জেলে তাঁর স্পাইনাল টিউবারকলোসিস রোগ ধরা পড়ে। কিন্তু জেলের ইংরেজ ডাক্তার তাঁকে ভুল ওষুধ দেওয়ায় অবস্থার অবনতি হয়। পরে অবশ্য সেই ডাক্তার ক্ষমা চেয়ে নেন অতুল্য ঘোষের কাছে। আর একবার জেলেই মেরে তাঁর ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। যার ফলে তাঁকে আজীবন খুঁড়িয়ে চলতে হয়েছে এবং শরীরের পিছনের দিকে তাঁকে আজীবন লোহার খাঁচা জাতীয় একটি সরঞ্জাম বেঁধে থাকতে হয়েছে।

আচ্ছা‚ এক ভদ্রলোকের‚ তাও আবার যে সে না‚ রীতিমতো একজন স্বাধীনতা যোদ্ধা, যিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে এক চোখ খুইয়েছেন! এবং আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ গঠনের জন্য বিরাট আন্দোলন করেছেন, তাঁকে আপনি কি করবেন? ব্যঙ্গ করবেন? “কানা” বলে ডাকবেন? নাম দেবেন “কানা অতুল্য”?

আপনি একজন জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমী হলে নিশ্চয়ই দেবেন না। দেওয়া তো দূর, মনে-মনে কল্পনাটা অবধি নিশ্চয়ই করবেন না। কিন্তু কমিউনিস্টরা করেছিল, শুধু তাইই নয়, তারা এই মহান ব্যক্তিত্বকে কোনোদিনই ন্যূনতম সম্মানটুকু অবধি দেয়নি। আর সে জন্যই এই মহান সর্বহারার দল এই যশস্বী ব্যক্তিকে নিয়ে তিনটে ছড়াও লিখে ফেলেছিল! পড়বেন ছড়া তিনটে?

১) দুআনা সের বেগুন কিনে
মন হলো প্রফুল্ল‚
বাড়িতে এসে কেটে দেখি
কানা অতুল্য।

২) ইন্দিরা মাসি বাজায় কাঁসি,
প্রফুল্ল বাজায় ঢোল।
আয় অতুল্য খাবি আয়,
কানা বেগুনের ঝোল।

৩) মাছের শত্রু কচুরিপানা‚
দেশের শত্রু অতুল্য কানা।

এই তিনটে ছড়া সেইসময় (১৯৬৭ সালে) সারা বাংলা জুড়ে দেয়ালে লিখে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল! শুধু তাইই না‚ তখন লাইট পোস্টের মাথায়-মাথায় কানা বেগুন ঝুলিয়ে রাখা হতো অন্ধ অতুল্য ঘোষের প্রতি ইঙ্গিত করে !

তাদের আরেকটা সম্মান প্রদর্শনের উদাহরণ শুনবেন?

অতুল্য ঘোষের বাঁকুড়া জেলায় একটি ছোট্ট বাড়ি ছিলো। গ্রামের বাড়িতে যেমন হয়, এই বাড়ির সামনেও একটি পুকুর ছিলো। দূরে দেখা যেতো পাহাড়। বামপন্থী নেতা যতীন চক্রবর্তী সেদিন এর বর্ণনা দিয়েছিলেন এইভাবে, “আপনাদের বঙ্গেশ্বর অতুল্য ঘোষ বাঁকুড়ায় সুইমিং পুল করেছেন, বিরাট রাজপ্রাসাদ করেছেন। সেখানে উনি এক চোখ দিয়ে অর্ধ-উলঙ্গ যুবতীদের স্নান উপভোগ করেন। বলুন, সেই বঙ্গেশ্বর ও তাঁর দলের পাণ্ডাদের দিয়ে কি সরকার চলে?”

আজ্ঞে হ্যাঁ‚ এই প্রজাতির নামই মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট! এরাই ছিল বাঙালি হিন্দুর একমাত্র বাসভূমি পশ্চিমবঙ্গ গঠনের চরম বিরোধী। অতএব, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির অন্যতম কারিগর শ্রী অতুল্য ঘোষ যে এই মার্ক্সবাদীদের হাতে এভাবেই লাঞ্ছিত হবেন, এ আর বেশি কথা কি?

আরও একটা শুনবেন?

১৬৯৭ সালের ভোটের সময়ের ঘটনা এটা! অতুল্য ঘোষকে “পাকিস্তানের চর” (আজ্ঞে না ভুল পড়ছেন না) বানাতে তাঁর নামে কুৎসা রটানোর লক্ষ্যে একটি লিফলেটের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল দিল্লিতে বসে। সেখানে ছাপাতে গেলে যদি জানাজানি হয়ে যায়, সে জন্য ওই খসড়া পাঠিয়ে দেওয়া হল পাটনায়! সেখানেই ছাপা হলো সেই লিফলেট! যার সারমর্ম ছিলো, “অতুল্য ঘোষ একজন পাকিস্তানের চর। কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি দেশকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেবার চক্রান্ত করেছেন”।

তাঁর লেখা বলে একটি জাল চিঠি এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা দফতর থেকে আসা কতগুলি জাল প্রত্যুত্তর ব্যাখ্য দিয়ে ছাপানো হল। কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হলো, গভীর রাতে অতুল্য ঘোষের নির্বাচন কেন্দ্রে ঘুরে
ঘুরে এগুলি ছড়িয়ে দিতে হবে। বামেদের এই পরিকল্পিত মিথ্যাচারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিলো। সেবার অতুল্য ঘোষ হেরে যান নির্বাচনে।

শেষপাতে আরও একটা শুনতে চান? আরো জানতে চান এই অত্যন্ত ভালো মানুষটি কিভাবে চরমতম হেনস্থার শিকার হয়েছিল কমিউনিস্টদের দ্বারা? শুনুন তবে।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির তরফে প্রচার করা হলো, কংগ্রেস সরকারকে ব্যবহার করে বর্তমান বিবাদি বাগের “স্টিফেন হাউস” নামের প্রাসাদ তুল্য বাড়িটি মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন এবং অতুল্য ঘোষ — এই দু’জনে মিলে কিনে নিয়েছেন বা দখল নিয়েছেন। কমিউনিস্টরা চিরকালই প্রোপাগান্ডা ছড়াতে চ্যাম্পিয়ন! সেই সময়ে এমন জবরদস্ত প্রচার মানুষ বিশ্বাসও করেছিলো। স্টেটসম্যান পত্রিকার প্রাক্তন চিফ রিপোর্টার মিহির মুখোপাধ্যায় অনেক পরে তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, “সাধারন মানুষ তো কোন ছাড়, তাঁর বহু বন্ধুবান্ধবও একথা বিশ্বাস করেছিলেন!”

এই প্রচার যে মিথ্যে ছিলো, তা বোঝানোর জন্যে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। প্রফুল্ল সেনের শেষ জীবন কেটেছিল অন্যের আশ্রয়ে! অশোককৃষ্ণ দত্ত তাঁর মিডলটন রোডের ফ্ল্যাটে প্রফুল্ল সেনকে শেষজীবনে থাকতে না দিলে, স্টিফেন হাউসের তথাকথিত মালিক হতভাগ্য এই লোকটি হয়তো বৃদ্ধ বয়সে থাকার জায়গাও পেতেননা! যে সব বাঙালি গোটা পৃথিবীর জন্য কাজ করেছেন, তাদের বাঙালি জাতি সম্মান করে। যে সব বাঙালি দেশের জন্য কাজ করেছেন, বাঙালি জাতি তাদেরকেও সম্মান করে। কিন্তু যেসব বাঙালি স্বজাতির স্বার্থে, পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে কাজ করেছেন; বাঙালি জাতি তাদেরকে মনে রাখে না, ভুলে যায়। এজন্যই কি পশ্চিমবঙ্গ গড়ার আন্দোলন করে, পশ্চিমবঙ্গেই উপেক্ষিত অবহেলিত থেকে যান অতুল্য ঘোষেরা?

ক্যা

-সুপ্রিয় ব্যানার্জি

পুবের রবি অস্ত গেল
পশ্চিমেতে নামল ঢল,
বাঁচাতে ধর্ম বাঁচাতে আব্রু
দ্যাশ ছাড়ল হিঁদুর দল।
মরুঝড়ে পড়ল চাপা
শস্যশ্যামল বাংলাদেশ,
টিমটিমিয়ে জ্বলছে প্রদীপ
তুলসী তলায় ভয়ের রেশ।
প্রাণ বাঁচাতে মান বাঁচাতে
গঙ্গা পাড়ে নতুন ঘর,
সসন্মানে বাঁচতে সেথা
CAA যেন বিধাতার বর।
পদ্মা ছেড়ে গঙ্গা পাড়ে
দুর্গাপুজোর ডাকের সাজ,
মনের সুখে তের পার্বন
সাঁঝবেলাতে শাঁখের আওয়াজ।

সোনার বাঙ্গলার দখলদার
নজর তাহার অন্ধ নয়,
দৃষ্টি এসে পড়ল হেথা
নতুন করে জাগল ভয়।
সমাজের যত জ্ঞানীগুণী
অন্ধ সেজে মুখ লুকায়,
ব্যবসাদারী বুদ্ধি তাদের
লোভে, ভয়ে বিবেক বিকায়।
নামল তারা রাজপথে আজ
নাগরিকত্বের বিরোধীতায়,
উদ্বাস্তু বাঙ্গালীর তারা
আজও চরম ক্ষতি চায়।
তবু আমরা থামব না
নিজের ক্ষতি করব না,
লড়ব সবে রাজপথেতেই
ভূমিহীন হব না।
CAA মোদের বাহুবল
NPR অস্ত্র আজ,
দুই হাতে দুই খড়গ ধরে
বঙ্গে মোরাই করব রাজ।

বাঘের মুখে বাঙালি হিন্দু

-রজত রায়

সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারদের আনাগোনা কবে থেকে শুরু সেটা সঠিক কজন বলতে পারবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু ওই বাঘের দল কবে থেকে মানুষখেকো হয়ে উঠল, এটা কিন্তু অনেকেই বলতে পারবেন। সেটা ছিল কেঁদো বাঘেদের সবচাইতে আনন্দের দিন, পরিতৃপ্তির দিন। ইংরেজি ১৯৭৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি তারিখটা। তাদের সামনে তখন রাশি রাশি খাবার। নিতান্ত দরিদ্র, হতভাগ্য পূর্ব পাকিস্তান, পরবর্তী বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত,বিতাড়িত, দণ্ডকারণ্য হয়ে মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নেওয়া গরিব, নমঃশূদ্র বাঙ্গালী হিন্দুদের লাশ। বাঘেরা প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছিলো, ধন্যবাদ জানিয়েছিলো তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার এবং বামপন্থী ক্যাডারদের। বামপন্থী হার্মাদরাই তো মরিচঝাঁপির অসহায় বাঙালি হিন্দুদের, শ্রী, পুরুষ নির্বিশেষে হত্যা করে টাইগার প্রজেক্টে লাশ ফেলে দিয়েছিল বাঘেদের খাবার জন্য। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়েও জঘন্য কোন গণহত্যা আছে কি?

এটাই বামপন্থীদের প্রকৃত চরিত্র। ওরা দলিত, নমঃশূদ্র বাঙালি হিন্দু বিদ্বেষী। কি অপরাধ ছিলো ওই বাঙালি হিন্দুদের? ঐ মন্ডল,বাছার,দাস পদবীধারী বাঙ্গালী হিন্দুদের? চূড়ান্ত নিপীড়িত হয়ে তারা পূর্ব বাংলা থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছিল রুক্ষ দণ্ডকারণ্যে বাস করতে। নদীমাতৃক দেশের মাটিতে ফসল ফলাতে অভ্যস্ত বাঙ্গালী হিন্দুদের ওখানকার জমিতে ফসল ফলানোর ক্ষমতা ছিলো না। একইসঙ্গে প্রখর গরম ও কনকনে ঠান্ডার আবহাওয়া সহ্য করবার ক্ষমতাও তাদের ছিলো না। উদ্বাস্তু বাঙালি ভোটের আশায়, বিরোধী বামফ্রন্ট (পশ্চিমবঙ্গের সরকারে তখন কংগ্রেস) তাদের কথা দিয়েছিলো যে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে পশ্চিমবাংলায় তাদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। ক্ষমতা পাওয়ার পরে বামফ্রন্ট সরকার রাতারাতি অবস্থান পরিবর্তন করে নিলো। বামপন্থীদের মুখ আর মুখোশের পার্থক্য পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠল। সরকারে থাকলে এক রকম আর সরকার না থাকলে আরেক রকম- এই দুমুখো নীতির সফল ব্যবহার না করলে আর বামপন্থী কিসের!

ইসলামিক জিহাদিরা যেমন সংখ্যালঘু থাকলে এক রকম আচরণ করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে বিপরীত আচরণ করে, বামেরাও ঠিক একই রকম। উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উদ্বাস্তু উন্নয়ন সমিতির নেতা সতীশ মন্ডলের নেতৃত্বে যারা কোনক্রমে মরিচঝাঁপি পৌঁছেছিলো, মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য ভূমিকে যারা বহুলাংশে মনুষ্য বসবাসের যোগ্য করে তুলেছিলো, তাদের উপর নেমে এসেছিলো বামপন্থী নির্যাতনের খাঁড়া। তাদেরকে বলা হলো দন্ডকারণ্যে ফিরে যেতে। মানুষগুলো দণ্ডকারণ্যে নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে এখানে এসেছিলো। এবার তারা যাবে কোথায়? তারা যেতে অস্বীকার করলো। বামপন্থী সরকার ওখানে পুলিশের লঞ্চ দিয়ে চারদিক ঘিরে অবরোধ তৈরি করলো। ঐ হিন্দু বাঙ্গালীদের কাছে খাদ্য , পানীয় জল , শিশুদের খাবার, ওষুধ , কিছুই পৌঁছাতে দিলো না। যে বামপন্থীরা এখন খাদ্য চাই, ভাত চাই বলে স্লোগান দেয়, তারা অসহায় দরিদ্র নিপীড়িত বাঙালি হিন্দুদের পানীয় জল এবং খাবার বন্ধ করে দিলো। এলাকার সবেধন নীলমণি টিউবওয়েলটাতে মিশিয়ে দেওয়া হল বিষ। কতটা অমানবিক, পৈশাচিক হলে এ জিনিস সম্ভব যে বাচ্চাদের মুখে যাতে একদানা খাবার না উঠে, সে ব্যবস্থা করা।

এই অমানবিকতাই বামপন্থীদের প্রকৃত স্বরূপ। সরকার পুলিশ দিয়ে এই ব্যবস্থা করেছিলো। যদি একা পুলিশ না পারে, সেজন্য বামপন্থী ক্যাডাররাও যোগ দিলো। একদম মরিয়া হয়ে ৩০ শে জানুয়ারি কয়েকজন বাঙালি হিন্দু পাশের কুমিরমারী দ্বীপে গিয়েছিলো শুধু বাচ্চাদের জন্য খাবার আর ওষুধ সংগ্রহ করবার জন্য। কুমিরমারি বাজারে পুলিশের লোকেরা ওদের চিনে ফেললো। ওখানেই গুলি করে হত্যা করলো ১২ জনকে।পানীয় জল আর বাচ্চাদের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে গিয়েছিলো, এটাই ছিলো বামপন্থী সরকারের কাছে অপরাধ। হ্যাঁ , এটাই বামপন্থীদের প্রকৃত চরিত্র। সেদিন রাত্রিবেলা মিটিংয়ে বসে উদ্বাস্তু হিন্দুরা পরিকল্পনা করলো যে পরের দিন ১৬ জন মহিলা যাবে খাদ্য-পানীয় সংগ্রহের জন্য। তারা ভেবেছিলো, পুলিশ ও বামপন্থী ক্যাডাররা মেয়েদের কিছু করবে না। তারা বুঝতে ভুল করেছিলো। বামপন্থীদের তারা চিনতে পারেনি।

১০ টি ডিঙ্গি নৌকাতে ১৬ জন যুবতী যাচ্ছিলো। পুলিশ তাদের লঞ্চ ঐ নৌকাগুলিরর উপর তুলে দিলো।প্রাণ বাঁচাতে ঐ মেয়েরা নদীতে ঝাঁপিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করলো। তখন সেখানে পুলিশ গুলি চালায়। দুজন মহিলা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। কুমিরের খাদ্য হিসেবে তাদের রায়মঙ্গল নদীতে ছুড়ে ফেলা হলো।বাকি ১৪ জনকে পুলিশ থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। ৫ দিন পরে বহুদুরে মুমূর্ষ অবস্থায় তাদের পাওয়া যায়। তারা জানায় যে তাদের প্রত্যেককে বহুবার করে ধর্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ দিয়ে ধর্ষণ করানো। বামপন্থী সরকার করিয়েছিলো। হ্যাঁ, এটাই বামপন্থী সরকারের প্রকৃত স্বরূপ। ঐ ৩১ শে জানুয়ারিতেই পুলিশ আর বামপন্থী ক্যাডাররা একযোগে ওই মরিচঝাঁপির মাটিতে ধ্বংসের পিশাচনৃত্য নাচলো।কতজন মারা গেছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। বাইরের কাউকে সরকার ঢুকতে দেয়নি। কিন্তু প্রায় সকলেই একমত যে মৃতের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। তাদের ফেলা হয়েছিল কাউকে নদীতে কাউকে টাইগার প্রজেক্টে বাঘের খাদ্য হিসেবে। নির্বিচারে মহিলাদের ধর্ষণ করেছিলো বামপন্থী সরকারের পুলিশ ও বামপন্থী ক্যাডাররা। হ্যাঁ, এটাই বামপন্থীদের প্রকৃত স্বরূপ। হত্যার হাত থেকে শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ কেউই বাদ যায় নি।

ক্যালেন্ডার দেখলে বুঝবেন, ঐ বছর ১ লা ফেব্রুয়ারি ছিলো সরস্বতী পূজো। সরস্বতী পূজোর আয়োজনের জন্য আগেরদিন মানে ৩১ তারিখ একটি কুঁড়েঘরে কিছু বাচ্চা জমা হয়েছিলো ( যেটা ওদের স্কুল ছিলো)। বাইরে আর্তচিৎকার শুনে ভয়ে ওরা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আওয়াজ শুনে ওখানে ঢুকে পুলিশ আর বামপন্থী ক্যাডাররা বাচ্চাগুলোকে খুন করেছিলো। শুধু তাই নয়, প্রচণ্ড আক্রোশে সরস্বতী প্রতিমা গুড়ো গুড়ো করে দিয়েছিল। আশ্চর্যের কিছু নেই, সরস্বতী প্রতিমা ধ্বংস করাটাই বামপন্থীদের সুপ্ত লক্ষ্য। ওদের সঙ্গে ইসলামিক জেহাদিদের কোন পার্থক্য নেই। তার পরবর্তী পর্যায়ে, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিলো ঐ অসহায় বাঙ্গালী হিন্দুদের সব কুঁড়েঘরগুলিকে। যেন কোথাও কোন চিহ্ন না থাকে, যে এখানেই ঘটে গিয়েছিল স্বাধীন ভারতের সবচে নিকৃষ্ট গণহত্যা। জুন মাসের মধ্যে সবাইকে উৎখাত করে আবার দণ্ডকারণ্যে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছিলো। একটা মরিচঝাঁপি বামপন্থীদের গরিব-দরদী মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার জন্যে যথেষ্ট। এই করুণ, মর্মন্তুদ ইতিহাস কি আমরা ভুলে যাবো? বাঙ্গালী হিন্দুদের হত্যার এই ইতিহাস ভুলে গেলে স্বয়ং ঈশ্বরও আমাদের ক্ষমা করবেন না।

মরিচঝাঁপির কালো রাত

-সুপ্রিয় ব্যানার্জি

বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় কারনে বিতাড়িত হতভাগ্য হিন্দুরা ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছিল দন্ডকারণ্যে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের বলেছিল – তোমরা এস, পাঁচ কোটি বাঙালীর দশ কোটি হাত তোমাদের স্বাগত জানাবে। সেই উদ্বাস্তুদের অধিকাংশ ছিল নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের। জ্যোতি বসুর আহ্বানে দেড় লক্ষ মানুষ এল এই বাংলায়।
এই ঘোষণা আর বাস্তবায়নের সময়টুকুর মধ্যেই বদলে গেছিল সরকারের মন। উদ্বাস্তু বোঝাই ট্রেন পশ্চিমবঙ্গে এলে, ট্রেন থেকে তাদের নামতে বাধা দেয় পার্টির ক্যাডার বাহিনী। ফিরতি ট্রেনে তুলে দেয় বহু লোককে। তার পরেও যারা নেমেছিল, তারা পার্টির লোকের চোখ এড়িয়ে হাসনাবাদ হয়ে নদী পার হয়। তাদের আশ্রয় হয় সুন্দরবনের দুর্গম মরিচঝাঁপি দ্বীপে। জনমানবহীন দ্বীপ। ম্যানগ্রোভ পরিস্কার করে বহু পরিশ্রমে দ্বীপকে বসবাসের যোগ্য করে তোলে তারা।
পরিস্থিতি কিন্তু অনেকটা অনুকুলে আসে ততদিনে। কারন মরিচঝাঁপির আশেপাশের দ্বীপ এবং গ্রামগুলি – সাতজেলিয়া, কুমিরমারি, ঝড়খালি, ছোট মোল্লাখালি ইত্যাদি এলাকাতে দীর্ঘ কাল যাবত খুলনা থেকে কয়েক দশক আগে আসা নমঃশূদ্রদের বাসস্থান ছিল। তারা আপন করে নিয়েছিল নতুনদের। অনেকেই একে ওপরের আত্মীয়, একই ভাষা, একই সংকৃতি এবং একই প্রান্তিক অবস্থান। স্থানীয় ভূমিহীন নমশূদ্রদের অনেকে মরিচঝাঁপিতে উদ্বাস্তুদের সাথে এসে বাস করা শুরু করলেন। নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়।
কিন্তু সুখ সইল না।
এল ঘোর অন্ধকার দিন। সরকার মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুদের সরকারী জমি বেআইনি অধিগ্রহণ এবং রিসার্ভ ফরেস্ট এর মধ্যে আইন ভঙ্গ করে বাসস্থান স্থাপনের দায়ে অভিযুক্ত বলে ঘোষণা করল।
রাজনীতির মধ্য গগনে তখন জ্যোতি বসু। সর্বহারার মহান নেতা। তিনি টাকি, ছোট মোল্লাখালিতে জনসভা করেন । আসে পাশের দ্বীপের বাসিন্দাদের বোঝানো হতে থাকে মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুরা তাদের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এইভাবে উদ্বাস্তু উচ্ছেদের পটভূমী তৈরি হতে থাকে। কিন্তু যখন ধমক চমকে কাজ হলনা, মরিচঝাঁপির একজন উদ্বাস্তুও পুনরায় স্বেছায় দণ্ডকারণ্য ফিরে যেতে রাজী হলেন না তখন শুরু হোল ভাতে মারার চক্রান্ত, অমানবিক অর্থনৈতিক অবরোধ।
২৪শে জানুয়ারি ১৯৭৯ : ৩০ টি পুলিশ লঞ্চ ঘিরে ফেলে মরিচঝাঁপি দ্বীপ।


২৭শে জানুয়ারি ১৯৭৯ : ১৪৪ ধারা জারী হয়। অবরূদ্ধ হয় দ্বীপ। মরিচঝাঁপি থেকে বেরনো এবং ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়ে যায়। পানীয় জলের উৎস টিউবওয়েল উপড়ে ফেলা হয়। অনেকের খড়ের ঘর জ্বালান হয়। অন্য দ্বীপে পালাতে যাওয়া তাদের নৌকাগুলো লঞ্চের ধাক্কায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
অতঃপর এল ৩১শে জানুয়ারী। ঠিক ৩৯ বছর আগের আজকের দিন। অর্থনৈতিক অবরোধ ও দৈহিক নির্যাতন যথেষ্ট বলে মনে করল না সরকার। উদ্বাস্তুদের ওপর গুলি চলল। হতাহতের সংখ্যা আজও অজানা। স্থানীয়রা বলে ৩৬ জন এই ঘটনায় মারা যান। এরই মধ্যে পুলিশের চোখ এড়িয়ে নদী সাঁতরে একজন উদ্বাস্তু কলকাতা প্রেস ক্লাবে এসে কুমিরমারিতে গুলি চালনার বিবরণ দিলে অমৃতবাজার ও আনন্দবাজার পত্রিকায় ছবি সহ অত্যাচারের কাহিনী ছাপা হয়। ছি ছি করতে শুরু করল সবাই জ্যোতি বসুর নামে। বিধানসভায় কাশিকান্ত মৈত্র তীব্র প্রতিবাদ করেন। বিরোধীরা উদ্বাস্তুদের প্রতি অমানবিক অত্যাচারের প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেন। মরিচঝাঁপি উদ্বাস্তুদের সমর্থকেরা বিচারের আশায় হাইকোর্টে মামলা করেন। বিচারপতি উদ্বাস্তুদের পক্ষে রায় দেন, কিন্তু অর্থনৈতিক অবরোধ চলতেই থাকে। সরকারের চরম অসহযোগীতায় অনাহারে, পিপাসায়, অপুষ্টিতে মরিচঝাঁপির বাসিন্দারা মরতে থাকেন। মোট মৃতের সংখ্যা নিয়ে সাংবাদিক তুষার ভট্টাচার্য্য তার এক প্রামাণ্যচিত্রে একটা হিসাব দিয়েছেন অবশ্য। ২৪ জানুয়ারি থেকে শুরু অবরোধ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত অনাহারে ৯৪ জন এবং বিনা চিকিৎসায় ১৭৭ জন শিশু মারা গেছে। ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ২৪ জন, মারা গেছেন ২৩৯ জন। অনাহারে আত্মহত্যা করেছেন ২ জন। আহত ১৫০, নিখোজ ১২৮ জন এবং গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন ৫০০ জন। অন্যান্য ভাষ্যে সংখ্যাটা কয়েকগুণ।


কীর্তি ফাঁসের আশঙ্কায় তখন জ্যোতি বসু এবং সিপিএম নেতৃত্ব। চিরাচরিত কমিউনিষ্ট ধাঁচে গুজব ছড়ান হয় তাদের উদ্যোগে। মরিচঝাঁপি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, সেখানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবির চলছে, প্রেসের উচিৎ একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বেশী উত্তেজক খবর পরিবেশন না করে জাতীয় স্বার্থে সরকারের অনধিকার প্রবেশকারীদের উচ্ছেদের সমর্থনে বক্তব্য রাখা । কেন্দ্রে তখন মোররাজি দেশাই এর সংখ্যালঘু সরকার নিজের গদি বাঁচাতে মরিচঝাঁপির ঘটনা জেনেও কেন্দ্র চুপ করে থাকল। এভাবেই ধামাচাপা পড়ল মরিচঝাঁপি।


মরিচ-ঝাঁপি মরিচ-ঝাঁপি

-জয়দীপ ব্যানার্জি


মরিচ-ঝাঁপি মরিচ-ঝাঁপি
কি করে তোর কষ্ট মাপি
হিন্দু রক্তে ভাসালো সাগর
লাল-হার্মাদ ভন্ড পাপী
মরিচ-ঝাঁপি মরিচ-ঝাঁপি

মরিচ-ঝাঁপি মরিচ-ঝাঁপি
আয় বুকে আয় কষ্ট মাপি
ভুলিনি ব্যথা, লাল-সন্ত্রাসী
করি না ক্ষমা জীবনব্যাপী
মরিচ-ঝাঁপি মরিচ-ঝাঁপি

Blog at WordPress.com.

Up ↑

Design a site like this with WordPress.com
Get started