বামপন্থী ভণ্ডামি দেশে বিদেশে

নির্ভয়া কান্ডের আসামি দের ফাসির ঘোষণা হতেই বামপন্থীদের এক অংশ এর বিরোধিতা করতে উঠে পড়ে লেগেছে, কারন রাষ্ট্রিয় হত্যার নাকি তারা ঘোর বিরোধী। কেবলমাত্র রাষ্ট্রিয় হত্যা নয় তারা রাজনৈতিক হিংসার ও বিরোধী। ভারতের কমিউনিস্ট রা ব্যক্তি স্বাধীনতাতে বিশ্বাস করে সুতরাং সকল মত কেই সমান অধিকার দেয়। সে রাজনৈতিক বিরোধী হলে ও তার মতের সম্মান দেয়। না আমি বলছি না যে এটা কমিউনিস্ট দের মতাদর্শ; এটা হল “কমিউনিস্ট মতাদর্শ” বলে মার্ক্সবাদীদের দাবি। এমন ভণ্ডামি দেখলে না হেসে থাকা যায় না। ভাবছেন, কিসের ভণ্ডামি? আসুন তবে জেনে নেই।

কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে গেছেন কখনো? গেলে দেখবেন তাদের এক দেবতার ছবি সেখানে থাকবেই, নাম তার জোসেফ স্টালিন। এই মহামান্য মাকু-সর্দার তার শাসন কালে মাত্র ২ কোটি লোক হত্যা করেছিল। আজ্ঞে হ্যাঁ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেই এতজন মানুষকে খুন করা হয়। এছাড়াও আরো বহু কমিউনিস্ট ইশ্বর রয়েছেন; মাকু (মার্ক্সবাদী) জনতার কাছে যারা অজেয়-অমর-অক্ষয়। তবে আজ কেবলমাত্র একটি উদাহরণ দেব। বিরোধী দের জন্য জেহাদীদের শাস্তি যেমন চাপাতির কোপ তেমনি কমিউনিস্টদের নিদান হল মানুষ গুম করা। তারপর গুম হওয়া-দের সোজা চালান করা হত বন্দি শিবিরে (কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প)। জোসেফ স্তালিন এমনই এক কুখ্যাত বন্দি শিবির তৈরি করেছিল রাশিয়াতে; যেখানে মানুষ ঢুকত ঠিকই, কিন্তু এর কোনদিন বের হয়ে আসতে পারত না। গুলাগ নামের এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এ গোটা দেশের কোনা কোনা থেকে রাজনৈতিক বিরোধী দের আনা হত।এই ক্যাম্পে মহাপ্রভু স্তালিন হত্যা করেছিল মাত্র ১৬ লাখ লোক(সরকারি মতে)।আর ১৯৩২ সালে ইউক্রেনের হলমোদর তে স্তালিন এর হাতে মারা যায় মাত্র ১কোটি মানুষ।

কি ভাবে হত্যা করা হতো এদের???? হত্যার নানান
রোমাঞ্চকর পদ্ধতি ছিল। তার মধ্যে স্তালিন এর সবথেকে প্রিয় ছিল

ধীরে ধীরে মানুষগুলোকে শুকিয়ে মারা। ভারতের রাস্তায়-ঘাটে কারণে অকারণে “ভাত দে ভাত দে” বলে নাটক করে বেড়ানো পার্টির মসিহার মানুষ মারত কিভাবে? খাদ্য পানীয় সব কেড়ে নিয়ে।
কি মজাদার না????
কোন বনদুুুক লাগল না, একতাাাওও গুলি খসল না; অথচ
বন্দি মানুষ গুলো ইঁদুর কুকুর এমন কি মরা মানুষের মাংস ও খেতে বাধ্য হত। ব্যক্তি স্বাধীনতার এমন উপহার কমিউনিস্ট রা পৃথিবীর অনেক দেশেই দিয়েছে।না সাইবারি নানুর নেতাই নন্দীগ্রাম এগুলো নগন্য।

কি ভাবছেন??এমন হয় নাকি?? এতো হিপোক্রেসি?? রাজনীতি মানেই তো হিপোক্রেসি।যে যত মিথ্যা বলতে পারবে তার তথ্য তত গভীর মানবদরদি।হ্যাঁ দাদা এটাই কমিউনিজম।মাও সেতুং কে ভুলে গেলেন??ঐ যে বন্দুক এর নল যার ক্ষমতার উৎস সে কি মানুষ পুঁজ করেছিল??
কিন্তু ভারতবর্ষে আমরা কাকে ফ্যাসিস্ট বলে চিনি???
তার নাম নিলাম না,নাম নিলেই সাম্প্রদায়িক চাড্ডি লাগবে আমাকে।

~অর্ঘ চৌধুরী

বিস্তারিত Wiki & BBC link এ
👇👇👇👇

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Gulag

BBC link
👇👇

https://www.bbc.com/bengali/multimedia/2016/01/130617_pg_witness_gulag_survivor

Holodomor massacre
👇👇

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Holodomor

শাহীন বাগে হচ্ছেটা কি?

-রজত কান্তি দাস

দিল্লীর সাহিন বাগে রবিবার একটা গুজব রটানো হয়েছে যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হলে মুসলমানদের ধরে ধরে বন্ধ্যা করিয়ে দেওয়া হবে। সংসদে বিল এখনও আসেইনি কিন্তু কিভাবে মুসলমানদের নির্যাতন করা হবে, সেই বিষয়ে আগে থেকেই মিথ্যে প্রচার হচ্ছে! আমার মনে হয় দিল্লী নির্বাচনের পরই সংসদে এই বিল আসবে। এখন গুজব ছড়িয়ে বিরোধীরা মুসলিম ভোট কনসোলিডেট করতে চাইছে। কিন্তু মুসলিম ভোট তো এমনিতেই বিজেপির বিরুদ্ধে। তাহলে এত কষ্ট করার দরকারটা কি ছিল। মুসলিম ভোট পেতে গিয়ে হিন্দু ভোট না হাত থেকে বেরিয়ে যায় কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির এটাই দেখা প্রয়োজন। আগের ভোটব্যাঙ্ক পলিসি এখন যে আর চলবে না এটাই এখন বুঝতে হবে বিরোধীদের।

এদিকে দিল্লীতে বিহারীরাও ভোটের একটা বড় অংশ। এই বিহারীদের একটা অংশ লালুর সমর্থক এবং আরেকটা নীতিশের সমর্থক। তাই লালুর আরজেডি কংগ্রেসের হয়ে এবং নীতিশের জেডিইউ বিজেপির হয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাবে। এদের মধ্যে মুসলিম ভোটার মনে হয় কংগ্রেসকেই ভোট দেবেন।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পার্টির প্রতি অসন্তুষ্ট নেতা কুমার বিশ্বাস ইতিমধ্যেই কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। কুমার বিশ্বাস সুবক্তা, সেই সঙ্গে আম আদমি পার্টির অন্তত ২০-২৫ শতাংশ কর্মী কুমার বিশ্বাসের ফলোয়ার। কুমার বিশ্বাস বিজেপিতে যোগদান করবেন বলে একটি গুজব ছড়িয়েছে। মনে হয় এটা ঠিক। আসলে আম আদমি পার্টি কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে কিছুটা প্রতারণা করেছিল। কথা ছিল কুমার বিশ্বাসকে দিল্লী সরকারের তরফ থেকে রাজ্যসভায় পাঠানো হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেজরিওয়াল কংগ্রেস দলের একজন নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থীকে রাজ্যসভায় পাঠালেন। সুশীল গুপ্তা নামে এই ব্যক্তি কংগ্রেস ছেড়ে আম আদমি পার্টিতে জয়েন করে সোজা রাজ্য সভার সদস্য হয়ে যান। এই অত্যন্ত ধনী ব্যক্তিটি কি করে আপ দলের কাছ থেকে নমিনেশন পেলেন তা অবশ্যই বিতর্কের বিষয়। তবে এই সিদ্ধান্তের কারণে কুমার বিশ্বাস পার্টির মধ্যে থেকেও কেজরিওয়ালের সমালোচনা শুরু করে দেন। মনে হচ্ছে কুমার বিশ্বাস আম আদমি পার্টির মধ্যে বড়সড় ফাটল ধরিয়ে দেবেন। দিল্লীর যেসব এলাকাতে মুসলিম ভোটার কুড়ি শতাংশের ওপর সেখানে কংগ্রেসের জেতার সম্ভাবনা আছে। তাই দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনে কোন দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। আম আদমি পার্টির পুনরায় সরকার গঠন এখনো বিশ বাও জলে।

নেতাজি, বামপন্থা এবং হিন্দুত্ববাদ

-স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

বাঙালি জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান হলেন সুভাষ চন্দ্র বসু। তাঁকে নিয়ে বাঙালির উন্মাদনা প্রায় ব্যক্তি-পূজার সমতুল্য। জাতি হিসেবে আমরা কল্পনা-বিলাসী বলেই হয়তো নিজেদের সমস্ত আশা-আকাঙ্খার দায় নির্দ্বিধায় চাপিয়ে দিই সাড়ে সাত দশক ধরে নিখোঁজ সুভাষ চন্দ্রের ঘাড়ে। আজ সুভাষ থাকলে হয়তো দেশভাগ হত না, সুভাষ থাকলে বাঙালিকে উদ্বাস্তু হতে হত না, সুভাষ থাকলে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকত…. কত মানুষের যে কত রকম চাওয়া সুভাষ চন্দ্র-এর কাছে। রক্ত মাংসের একজন মানুষকে সমস্ত সীমা–পরিসীমার ঊর্ধ্বে তুলে দিয়েছি আমরা। নিজেদের অক্ষমতাকে ঢাকবার মোক্ষম ঢাল হিসেবে খাড়া করেছি অতীতের কিংবদন্তীকে। কয়েক কোটি বাঙালি যা যা করতে পারেনি, তার সমস্ত দায়িত্ব অপরিসীম নিশ্চিন্ততায় চাপিয়ে দিয়েছি ব্যক্তি সুভাষের ঘাড়ে। এটাই ব্যক্তি পূজার মাহাত্ম্য। মহাপুরুষদের দোষ-গুণ সমস্ত আড়াল করে, তাকে ভগবান হিসেবে দেখতে শেখায়।

আর যখনই কোন মহাপুরুষকে দেবতার আসনে বসানো হয়, তখনই অন্ধ-ভক্তি মানুষের চোখ দুটো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। আর অন্ধ মানুষকে ভুল রাস্তা দেখানোর থেকে সোজা কাজ আর নেই। এই কারণেই নব্য বাম এবং বাংলা ভাষা ভিত্তিক কিছু সংগঠন সুভাষ চন্দ্রকে ব্যবহার করা শুরু করেছে, নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। সুভাষ চন্দ্র-এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কিছু ঐতিহাসিক কার্যকলাপ তুলে এনে, এরা প্রমাণ করতে চাইছেন যে নেতাজি নিজেই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ, কলকাতাকে প্রথম মুসলমান মেয়র উপহার দেন নেতাজি স্বয়ং। পৌরসভায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতাজি মুসলিমদের জন্য ৫০%-এর অধিক সংরক্ষণ চালু করেন। এমন কি এর স্বপক্ষে নেতাজি যুক্তি দিয়েছিলেন, সেটা অনেকটা এরকম- “হিন্দুরা তো বহুদিন সরকারি কাজে প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য পেয়ে এসেছে। অতএব মুস্লিম এবং খ্রিস্টানদের চাকরিতে সাম্য দিতেই এমন সংরক্ষণ দরকার।” সুভাষের রাজনৈতিক গুরু বলে পরিচিত চিত্তরঞ্জন দাশ যে “বঙ্গীয় চুক্তি”র (বেঙ্গল প্যাক্ট) খসড়া তৈরি করেছিলেন, তাতেও হিন্দু মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংরক্ষণের শর্ত ছিল। এই “বঙ্গীয় চুক্তি” সুভাষ চন্দ্র মেনে নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগের সাথে রাজনৈতিক জোট করলেও, হিন্দু মহাসভার বিষয়ে বিভিন্ন রকম নেতিবাচক মন্তব্য সুভাষ চন্দ্র বিবৃতি হিসেবে দিয়েছেন। এই সমস্ত ইতিহাস তুলে ধরে খুব সুচতুর ভাবে বাঙালির আবেগের অপ-ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন নব্য বামপন্থী এবং সম-মনস্করা। এদের বক্তব্য হল, বাঙালিরা যদি সত্যিই সুভাষ চন্দ্রকে মানে, তাহলে তার প্রমান দিতে বাঙালিদেরকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম তোষণ মেনে নিতে হবে। হিন্দুত্ববাদ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং কোন অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির সমালোচনা করা যাবে না। যারা সুভাষ-প্রেমী, তারা সুভাষের দেখানো রাস্তায় হাঁটবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনে যারা সুভাষ চন্দ্রের কাজগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন না, তারা আসলে সুভাষ-বিরোধী।

এই ধরণের বামপন্থী দাবি আসলে নিজেদের অতীত ঢাকার একটা ফাঁদ। যারা একসময় সুভাষ চন্দ্রকে “তোজোর কুকুর” বলেছিল, যাকে নিয়ে কুৎসিত কার্টুন এঁকেছিল; আজ হঠাৎ তারাই সুভাষ-প্রেমে গদগদ হয়ে উঠলে, সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। অথচ নব্য বাম-দের এই পাতা ফাঁদেই পা দিয়ে ফেলছেন কিছু বাঙালি হিন্দুত্ববাদী। তাঁরা নেতাজির মূল্যায়ন করছেন ভারতের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে। অর্থাৎ নেতাজি যদি ইংরেজরা দেশ ছাড়ার পর সত্যিই ফিরে আসতেন এবং দেশের শাসন ক্ষমতা পেতেন; তাহলে তাঁর মুসলিম তোষণ নীতির জন্য হিন্দুদের নাভিশ্বাস উঠত। এরকম হিন্দুত্ববাদীদের উদ্দেশ্য সাধু হলেও, ব্যাখ্যা গুলো অতি-সরলীকরণে দুষ্ট।

কারণ নেতাজি যেসব মুসলিম তোষণ নীতি নিয়েছিলেন, সেগুলো নোয়াখালীর বাঙালি হিন্দু গণহত্যা এবং কলকাতার “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস” ঘটার প্রায় ৬ বছর আগের। এখন কোন নেতা তিনি যতই মহান হোন না কেন; যেহেতু তাঁরা অন্তর্যামী নন, তাদের পক্ষে কোন নীতির ভবিষ্যৎ কুফল বুঝতে পারা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া তখন তথ্য-প্রযুক্তির এত রমরমা ছিল না। ফলে ইসলামী জেহাদের স্বরূপ না জানার জন্য সুভাষ চন্দ্রকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। এবং যেহেতু নেতাজি বা আমরা কেউই ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা নই; অতএব স্বাধীনতা এবং দেশভাগে জেহাদের ভয়ঙ্করতম রূপ দেখার পরেও সুভাষ চন্দ্র তাঁর মুসলিম তোষণ চালিয়ে যেতেন কি না, এই বিষয়ে কোন সঠিক উত্তর পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। কাজেই কি হলে কি হত, এইরকম অনুমানের উপর নির্ভর করে সুভাষ-নিন্দা একেবারেই অনুচিত।

বাঙালি হিন্দুত্ববাদী-দের বরং মনোযোগ দেওয়া উচিত সুভাষ চন্দ্র-এর কাজের সঠিক মূল্যায়নের উপর। অন্য ধর্ম বা অন্য জাতিকে নিজের সাথে একতাবদ্ধ করতে যে কোন নেতা তিন রকম নীতি নিতে পারেন। তিরস্কার, পুরস্কার আর পরিষ্কার। এই পুরস্কার নীতি নিয়ে যত রকম পরীক্ষা সম্ভব হয়, তার সবগুলোই প্রায় নেতাজি করে গেছেন। মুসলমানদের সাথে এই নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম। অতএব নেতাজির উদাহরণ টেনে যারা নেহরু-মমতা-মুলায়মদের মুসলিম-তোষণ নীতিকে বৈধতা দিতে চান, তাঁরা ভণ্ড। এবং নেতাজির মুসলিম তোষণকে আদর্শ মেনে যারা বাঙালিকে উপদেশ দেন, আজকের মুসলিম-তোষণ মেনে নিতে, তাঁরা আরো বড় ভন্ড। মুসলমানদের প্রতি নেতাজির “পুরস্কার নীতি”-র ফল কি হয়েছিল, সেটা ৪৬-এর হিন্দু বিরোধী গণহত্যাতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। এটা নেতাজি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু নেহেরু দেখেছেন, মমতা-মুলায়ম সেই ইতিহাস পড়েছেন। কোন নীতি যখন আশানুরূপ ফল দেয় না, তখন সেই নীতি বদলে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। নেতাজির মত জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান যদি ইসলামী তোষণ নীতি দিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে চিরস্থায়ী সম্প্রীতি আনতে ব্যর্থ হন, তাহলে সফল হবে কে? নেতাজির ওই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই বরং নেতাজির প্রতি আসল শ্রদ্ধার্ঘ্য। এইটাই বাঙালি হিন্দুত্ববাদীদের যুক্তি হওয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে, বাঙালির শত্রু একটা নয়। তারা রয়েছে দিকে দিকে। উত্তর ভারতের এক দল “ভিরাট হিন্দুত্ববাদী” মুখিয়ে রয়েছে নেতাজির মুসলিম তোষণের ইতিহাসকে হাতিয়ার করে বাঙালি জাতিকে বদনাম করার চেষ্টায়। আমরা যেন না ভুলি, ভারতের নেতা-মন্ত্রীদের এই বিষয়ক ভাষণে ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদদের পাশে একমাত্র বাঙালি বিপ্লবী হিসেবে উল্লিখিত হয় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র-এর নাম। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিরা সবথেকে বেশি রক্ত ঝরানো সত্ত্বেও একজন নেতাজি ছাড়া আর কোন বাঙালি বিপ্লবীর নাম বাকি ভারতের লোকেরা শোনেইনি। কোনোভাবে যদি নেতাজিকে বদনাম করে দেওয়া যায়, একজনও বাঙালি বিপ্লবী অন্য ভারতীয় জাতিদের স্মৃতিতে থাকবে না। এই কারণেই আমাদের উচিত নেতাজিকে নিন্দা করার ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া। এবং প্রথম তোষক হবার জন্য আমাদের উচিত নেতাজির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। উনি এই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করলে, ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা আজকে সেটাকে বাতিল বলে গণ্য করতে পারতাম না। এই ধ্যান-ধারণাগুলো আরো আগে জনপ্রিয় করার চেষ্টা হয়নি, সেটা একান্তই আমাদের ব্যর্থতা। এতে তো নেতাজির কোন দায় নেই।

দোষ-গুন মিলিয়েই মানুষ, নেতাজিও এর ব্যতিক্রম নন। মহাপুরুষদের দোষ-গুন, ঠিক-ভুল, বর্তমানের আলোয় বিচার করতে হবে। তাঁদের ভুল গুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে আর গুন গুলোকে অনুসরণ করতে হবে। যারা তাঁর দোষগুলোকে গুণ বলে দেগে দিয়ে বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে, তাদেরকে প্রতিহত করার উদ্যোগ হিন্দুত্ববাদীদেরই নিতে হবে। ভুললে চলবে না, নেতাজি দেশের স্বাধীনতার জন্য অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। অসহযোগের নামে নিরস্ত্র জনতাকে অত্যাচারী ইংরেজদের লাঠি-গুলি খাবার দিকে লেলিয়ে দিয়ে নিজে প্রথম শ্রেণীর জেল কামরায় আরামদায়ক জীবন কাটানোর মত নোংরা গান্ধীবাদী নীতি সুভাষের ছিল না। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন চিরকাল। সারা বিশ্বে ইংরেজদের যত গুলো উপনিবেশ ছিল; তাদের মধ্যে একজনই সাহস দেখিয়েছেন বিশ্বসেরা ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলার। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার, এমনকি সেই স্বাধীনতার জন্য ইংরেজ-বিরোধী রাষ্ট্রের থেকে সমর্থন জোগাড় করার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য সবথেকে বিপজ্জনক বলে অভিহিত মানুষটা একজন বাঙালি, তিনিই সুভাষ চন্দ্র। নেতাজির জন্য গর্বিত হবার এটাই যথেষ্ট কারণ। আর তার জন্য নেতাজির ভুল গুলোকে অস্বীকার করার দরকার নেই। ব্যক্তি পূজা চাই না, কর্ম পূজা চাই। নেতাজির আত্ম-বিশ্বাস, নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা, দেশের জন্য সর্বস্ব পণ করার মানসিকতা বাঙালির হিন্দুত্বকে পথ দেখাক। অতীত একজন নেতাজিকে নিয়ে লেখা হয়েছিল, আগামী কাল বহু বহু নেতাজির হোক।

*জয় মা ভারতী*

জন্ম-নিয়ন্ত্রণ আইন মানে কি হিন্দু-নিয়ন্ত্রণ আইন?

-স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

হিন্দুদের সাথে আইনের সম্পর্ক হল মায়ের সাথে মা-ন্যাওটা বাচ্চাদের মতন। বাচ্চা যেমন মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে রাখে, হিন্দুরাও তেমন আইনের হাত ধরে পথ চলতে পছন্দ করে। আইন-সংবিধান, এসবের নাম হিন্দুরা প্রায় ইষ্টমন্ত্রের মত জপ করে। আইন যদি পক্ষপাত-দুষ্ট কিংবা অন্যায্যও হয়, তবুও হিন্দুরা তার প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। হিন্দুদের মধ্যে থেকে যে মানসিক দাসত্ব এখনো ঘোচেনি, তার সব থেকে বড় প্রমাণ হল এই অন্ধ আইন-নির্ভরতা। যখন ট্রাফিক আইনের সংশোধনী আনল কেন্দ্রীয় সরকার, একশ্রেণীর হিন্দুদের সে কি আনন্দ! হেলমেট না পড়ার জরিমানা বেড়ে ৫০০০/- টাকা হয়েছে; অতএব এবার মুসলমানি টুপি পড়ে বাইক চালকরা বুঝবে মজা! হেলমেট নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য। কোন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষা চায় কি না, বা চাইলে ঠিক কতটা; এটা ঠিক করার মালিক সে নিজে। হেলমেট পরা বা না পরার কারণে যেহেতু অন্যদের নিরাপত্তা ব্যাহত হয় না, তাই হেলমেট না পরার জন্য জরিমানা রাখার আমি কোন অর্থ খুঁজে পাই না। সিটবেল্টের ব্যাপারেও এই একই নীতি পালনীয় হওয়া উচিত। এখন মুসলমানরা যেহেতু স্বাধীনচেতা জাতি, তাই আইন যতই কঠোর হোক না কেন, সেগুলো তাদের ছুঁতেও পারে না। জরিমানা ৫০০০/- ই হোক কি ৫০,০০০/-, ট্রাফিক পুলিশরা সচরাচর ভাইজানদের ধরার আগ্রহ দেখান না। কারণ পুলিশের সাথে বোঝাপড়া করার নানান রাস্তা ওদের জানা আছে।

এ তো গেল হেলমেট-সিটবেল্টের কথা। এরপর হিন্দুদের দাবি হল, মুসলমানরা খুব বেপরোয়া বাইক চালায়। পথে-ঘাটে বাইক নিয়ে বিপজ্জনক সব স্টান্ট করে। অতএব কড়া ট্রাফিক আইন এলে লঙ্ঘনকারীরা সব শায়েস্তা হবে। এখন পুলিশের সাথে মিঞাভাইদের যে বোঝাপড়া গুলো হেলমেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; সেই একই জিনিস অন্যান্য যে কোন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে কড়াস্যঃ কড়া ট্রাফিক আইন কার উপর বল দেখাবে? হিন্দুদের উপর। দুর্বল, মিনমিনে হিন্দু নিত্যনতুন যত বাঁশ খাবে এসব আইনের হাতে; ততই মনে মনে সে আত্মপ্রসাদ লাভ করবে এই ভেবে যে মুসলিমরা নিশ্চয়ই আরো বেশি বেশি করে ধরা পড়ছে। “হিন্দুর নাক কেটে মুসলমানের যাত্রাভঙ্গ” করতে চাওয়াটা যে পণ্ডশ্রম, সেটা বোঝার মত বুদ্ধি হিন্দুদের নেই। অতিরিক্ত আইন-নির্ভরতা যে দুর্বলতার নামান্তর; এই ফাঁকিবাজিটা ওয়েসী ভাইরা ঠিকই ধরেছেন। হায়দ্রাবাদ থেকে দেওয়া কুখ্যাত বক্তৃতায় আকবরউদ্দিন ওয়েসী যে বলেছেন- “১৫ মিনিটের জন্য পুলিশ-প্রশাসন সরিয়ে নাও, ২৫ কোটি মুসলমান ১০০ কোটি হিন্দুকে দেখে নেবে”; সেটা এই কারণেই। হিন্দু সংখ্যাগুরু দেশে দাঁড়িয়ে এই ধরণের হিন্দু-বিদ্বেষী কথা শুনলে, লোকের রাগ হওয়া উচিত। কিন্তু হিন্দুদের হয় আতঙ্ক। কারণ হিন্দুদের মনের সুপ্ত ভয়টাকেই মৌখিক রূপ দিয়ে ফেলেছেন ওয়েসী ভায়েরা।

আইন দিয়ে নিজের সব সমস্যার সমাধান যে করতে চায়, জীবনে তারাই সবার থেকে বেশি লাঞ্ছিত হয়। এইভাবেই হিন্দুরা জন্মনিয়ন্ত্রণ আইনের পক্ষে সমর্থন বাড়াচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, সকলের জন্য দ্বিসন্তান নীতি এনে মুসলমানদের জন্মহার কমিয়ে ফেলা। অথচ আইন দিয়ে কারো জননাঙ্গ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, এটা আমার সাধারণ বৃদ্ধিতে ঢোকে না। দুয়ের বেশি সন্তান হলে কেন্দ্র সরকার কি করবে? সরকারি চাকরি কেড়ে নেবে? রেশন বন্ধ করে দেবে, অন্যান্য সরকারি সুবিধা কেড়ে নেবে? একইরকম আইন আগে থেকেই আসামে জারি রয়েছে। এমন কি কদিন আগে তৃতীয় সন্তান জন্মের জন্য এক মুসলিম মহিলাকে সরকারি পদ থেকে বরখাস্তও করা হয়। তবে এই ব্যাপারে শেষ কথাটি আসামের প্রভাবশালী নেতা বদরুদ্দীন আজমল আগেই বলে রেখেছেন। তাঁর বক্তব্য হল- “মুসলমান সরকারি চাকরির তোয়াক্কা করে না। তাই মুসলমানরা সন্তান নেওয়া কমাবে না।”

আজমল খুব ভাল করেই জানেন যে গণতান্ত্রিক দেশে বেশি সন্তান নিলে সরকারি সুবিধা বন্ধ করা ছাড়া কেন্দ্র সরকার আর বিশেষ কিছু করতে পারবে না। আর মুসলমানদের যাকাত আছে, গরিব মুসলিমের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ আছে। অতএব মুসলিমের ঘরে অধিক সন্তানদের খাওয়া-পরার সমস্যা অতটাও হবে না সরকারি সুবিধা সত্যিই বন্ধ হয়ে গেলে। ভারতবর্ষ তো চীন নয় যে দ্বিসন্তান নীতি না মানলে কারারুদ্ধ করা বা জরিমানা করার মত কঠোর নীতি নিতে পারবে। সঞ্জয় গান্ধীও বেঁচে নেই যে দুটির বেশি সন্তান নিলেই তাদের ধরে ধরে বাধ্যতামূলক ভাবে জনন-ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হবে। আর তাছাড়া আইন কেন্দ্র সরকার বানালেও তার প্রয়োগ করবে রাজ্য সরকার। নাগরিকত্বের মত বিষয়েই যখন একাধিক রাজ্য নিজের বিধানসভায় নাগরিকত্ব সংশোধনীর বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করাচ্ছে; তাহলে রেশনের চাল-ডাল এবং অন্যান্য সুবিধে কেন্দ্র সরকার বন্ধ করে দিলে, তার বিরুদ্ধে তো আরও অনেক বেশি রাজ্য প্রস্তাব পাশ করাবে। এবং যে পুলিশ সামান্য ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য মিঞাভাইদের জরিমানা করতে ভয় পায়; তারা দুয়ের বেশি সন্তান নেবার জন্য মুসলমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, এটা তো হাস্যকর চিন্তাভাবনা।

অতএব ওই দ্বিসন্তান আইন এক এবং একমাত্র প্রয়োগ হবে হিন্দুদের উপর। হিন্দুরাই বেশি করে চাকরির উপর নির্ভরশীল, অতএব চাকরি কেড়ে নেবার ভয় দেখিয়ে বাচ্চা কমানো যাবে শুধু হিন্দুদের। হিন্দুদের মধ্যেই ভ্রাতৃত্ব বোধ কম, যাকাতের মত কোন ব্যবস্থাও নেই; অতএব সরকারি সুবিধা বন্ধ করে দিলেই হিন্দুরা এক্কেবারে কুপোকাত। সারা দেশে হিন্দুদের জন্মহার এমনিতেই দুইয়ের কম, বাঙালিদের সেটা একের সামান্য উপরে। যে গুটিকয় বাঙালি এবং অবাঙালি হিন্দু দুইয়ের বেশি সন্তান নিচ্ছিলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ আইন এলে এবার সেটাও বন্ধ হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ আইন কার্যক্ষেত্রে হিন্দু-নিয়ন্ত্রণ আইনে পরিণত হবে। গোটা ভারতে বিহারী এবং মুসলমানদের অধিক জন্মহারের শাস্তি ভারতের প্রত্যেকটা জাতি পেতে চলেছে। এটাই ধর্মনিরপেক্ষ জন্মনিয়ন্ত্রণ আইনের মহিমা! এক-দুজনের পাপে সকলের সমান শাস্তি।

হিন্দুদের মধ্যেও আইনের শরণ নিতে সবথেকে ভালোবাসে বাঙালিরা, আর এইটাই একদিন আমাদের ধ্বংসের বড় কারণ হবে। আইন মানে ভাষার মারপ্যাঁচ নয়। বাঙালির কাছে আইন একটা সরলীকৃত ধারণা, যেটা চালু করলেই সব সমস্যার ঝটিতি সমাধান হয়ে যাবে। তাই প্রত্যেকটা সমস্যার জন্য একটা করে আইন রয়েছে আমাদের মনে। পাহাড় প্রমাণ জনসংখ্যা আটকাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইনে। রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনা কমাবে নতুন মোটর যান নিয়ন্ত্রণ আইন। অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করবে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বিধি। আমরা চাই আইনের কাছে স্বেচ্ছায় পরাধীন হতে। আমরা চাই আমাদের জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করুক কোন না কোন আইন। রাষ্ট্র আমাদেরকে বলে দিক কটা সন্তান হওয়া উচিত, গাড়ি চালানোর সময় কি পরা উচিত, নিজের নিরাপত্তা কিভাবে নিতে হবে। এবং বাঙালিরা নিজে আইন মেনে খুশি নয়। সে চায় অন্য ধর্ম এবং জাতির লোকেরাও এসব আইন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুক। বিহারী এবং মুসলমানেরা যখন নিজেদের ব্যক্তি-জীবনে আইনের খবরদারিকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে; বাঙালি তখন চায় অন্যদের আইন মানা বাধ্যতামূলক করার জন্য আরেকটা আইন বানাতে। যে জাতি মানসিক গঠনেই পরাধীন, তারা যে অন্যের স্বাধীনতা সহ্য করতে পারবে না, এটাই তো স্বাভাবিক।

বাঙালির মত আইনপ্রিয় জাতি বিশ্বে কমই রয়েছে। রাষ্ট্রকে আমরা পিতার জায়গায় বসিয়ে দিয়েছি। আইন হল সেই পিতার শাসন। জেল-জরিমানা হল পিতার দেওয়া শাস্তি। আইনের এমন একটা ধারণায় আমরা বিশ্বাস করি, যার উপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। মায়ের পেট থেকে বেরোনোর এত বছর পরেও আমরা স্বাবলম্বী হতে পারিনি। আমরা এমন একটা আইন ব্যবস্থা খাড়া করতে চাই, যাতে যে কোন সমস্যায় তার কাছে গিয়ে নালিশ ঠুকলেই হয়। তারপর আমাদের দায়িত্ব শেষ। বিপদে পড়লে রাস্তার এক দিক থেকে হাঁক পাড়লে, আইন আমাদের আঙ্গুল ধরে রাস্তা পার করিয়ে দেবে। বাঙালি চায় আইনের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। সে আইন ভাল না মন্দ, ন্যায্য কি অন্যায্য এসব প্রশ্ন তুলতে আমরা ভুলে গেছি। আমরা জানতেও চাই না আইনগুলোর ছত্রে ছত্রে কি লেখা রয়েছে। নিজেদের ভাগ্যকে নিশ্চিন্তে সপে দিয়েছি পরের লেখা কিছু জটিল লাইনের কাছে। আইনই সেই রাখাল, হিন্দুরা যার ভেড়ার পাল।

মধ্যযুগে ভারতের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্ম পালন

রজতকান্তি দাস

দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যেই ভারতে সামন্ততন্ত্রের অনেকটাই বিকাশ লাভ করেছিল সেই সঙ্গে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই বাণিজ্যিক পুঁজিরও জন্ম লাভ করে। তখনও পর্যন্ত বৃহৎ শ্রমশিল্পের প্রসার ঘটেনি। উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রামীণ স্তরে কুটির শিল্পের মধ্যেই সীমিত ছিল। তবে এই সময়ে ভারতের সর্বক্ষেত্রে ধর্ম পালনের এক বিশেষ উৎসাহ দেখা দেয় যা কমবেশি এখনও আছে। কার্ল মার্ক্স যদিও ধর্মকে আফিমের সঙ্গে তুলনা করেছেন তবে মধ্যযুগে ভারতের আপামর জনগণ ধর্ম পালনকে জীবনযাত্রা নির্বাহের উপায় হিসেবে দেখতে পেয়েছিলেন।

ব্রাহ্মণ্যধর্মে সমাজের নিম্ন বর্ণের মানুষদের খাটো করে দেখানোর তাগিদ ছিল ঠিকই কিন্তু নিচু জাতির মধ্যেও নিজস্ব দেবদেবীর পূজার্চনা অব্যাহত ছিল যেখানে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তেমন প্রভাব পড়েনি। তাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে সমাজ সংস্কার ঘটেছিল তা মূলত উঁচু বর্ণের ব্রাহ্মণদের মধ্যেই সীমিত ছিল। যেমন সতীদাহ প্রথা, বহু বিবাহ ইত্যাদি মূলত কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যেই সীমিত ছিল। তবে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সব ধর্মাচার ছিল তার মধ্যে বিভিন্নতা এতো বেশি যে কোন এক প্রতিষ্ঠিত ধর্মাচার সারা ভারতজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি। তবে অসংখ্য দেবদেবীর মধ্যে নিজের পছন্দমত দেবতাকে চয়ন করে তার পুজো করার স্বাধীনতা যে ছিল তার থেকেই ধর্মাচারের মধ্যে এক ধরণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্ম নিয়েছিল।

তাই ধর্মীয় ভাবে যে উগ্রতা কার্ল মার্ক্স ইউরোপীয় সমাজে লক্ষ্য করেছিলেন তা ভারতে ততটা ছিল না।ভারতভূমিতে হিন্দু ধর্মের মধ্যেও অসংখ্য ধর্মমতের সহাবস্থান ছিল। এর মধ্যে বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্তধর্ম প্রধান হলেও এর মধ্যেও মধ্যে নানা বিভাজন ছিল এবং এখনও আছে। এছাড়া পার্বত্য উপজাতিদের মধ্যেও নানা ধরণের ধর্মমত প্রচলিত আছে যা ‘এনিমিস্ট রিলিজিয়ন’ বলে খ্যাত। যেমন মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ে ‘সেং খাসি’ ধর্ম কিংবা অরুণাচল প্রদেশে ‘ডইনি পোলো’ এই ধরণের এনিমিস্ট রিলিজিয়ন। এইসব ধর্মের মধ্যেও নিজস্ব দর্শন আছে যা অনেক উদার ও সাম্যবাদী। তবে এইসব ধর্মে প্রকৃতির গাছপালা, পাথর ইত্যাদিকে পুজো করার প্রবণতা আছে। এই প্রবণতা বাঙালীদের মধ্যেও আছে |আমি শিলঙে আমার বাড়ির কাছেই আমাদের পাড়ার লোকদের ভৈরব গাছ ও রূপসী গাছকে পুজো করতে দেখেছি। এছাড়া পাথরকে তো নানা সম্প্রদায়ের হিন্দুরা আজো পুজো করেন। এই সমস্ত পূজার্চনায় মানুষের মনের মধ্যে এক ধরণের তৃপ্তি থাকতে পারে কিন্তু কোন অবস্থাতেই এগুলোকে শ্রেণিগত শোষণের হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে না।

মধ্য যুগে মানুষের বিশ্ববীক্ষার প্রকাশ ঘটত তার ধর্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। মূলত ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভারতে একদিকে যেমন বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয় হতে শুরু করে তেমনি হিন্দুধর্মের প্রাধান্যও বাড়তে থাকে। কার্ল মার্ক্স বৌদ্ধ ধর্মকেই সবচাইতে উন্নতমানের ধর্ম হিসেবে ব্যক্ত করলেও মধ্যযুগে এই ধর্মের ভিত দুর্বল হতে থাকে। সম্রাট অশোকের পর হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে বৌদ্ধধর্মের শেষ উজ্জীবন ঘটেছিল। ওই সময়ে বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ থেকে হাজার হাজার ছাত্রদের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে এসে বৌদ্ধধর্মের ওপর শিক্ষা দেওয়া হতো। বঙ্গদেশের পাল-রাজবংশও বৌদ্ধধর্মের সমর্থক ছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে বঙ্গদেশের জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশই ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর পর থেকেই বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গভূমির একেবারে শেষ প্রান্তে চট্টগ্রাম এলাকায় কিছু কিছু বৌদ্ধধর্মের লোকেরা আজও এই ধর্ম পালন করে চলেছেন বটে তবে বাকিরা আবার হিন্দুধর্মে ফিরে এসেছেন। নতুবা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

অবলম্বিত এই ধর্মমতের পরিবর্তনে জীবনযাত্রার পদ্ধতিতে কিন্তু পরিবর্তন ঘটেনি। হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে বহুসংখ্যক ধর্ম-সম্প্রদায় ও ধর্মমত। এদের মধ্যে পার্থক্য শুধু ভক্তের উপাস্য হিন্দু দেবদেবীদের ব্যাপক সমাবেশের মধ্যে থেকে নিজেদের মনোমতো দেবতা নির্বাচনে এবং সেই সঙ্গে ধর্মীয় আচার-আচরণ ও রীতিনীতি পালনের বিভিন্নতায়। তবে কিছু কিছু রীতিনীতি ও ধ্যানধারণা সকল হিন্দুদের পক্ষেই এক। যেমন নিজ কর্তব্য পালন যা গীতার মূল বাণী তা হিন্দু সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছিল মানুষের মনে। এর মধ্যে অবিচল নিষ্ঠা নিয়ে নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উচ্চ ও নীচ সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই এই ভাব জাগানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। যেমন উচ্চতর সম্প্রদায়ের পক্ষে ধর্মপালন ছিল প্রশাসন পরিচালনা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে বীরোচিত আচরণ তেমনি নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে ছিল তাদের ঐতিয্যসিদ্ধ পেশাগুলিকে সবিবেক কার্যকর করে চলা এবং উচ্চবর্ণের মানুষের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা-প্রদর্শন করা। সময়ের ধারায় এর মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বলা চলে। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের উন্মেষের ফলে পেশাগত পরিবর্তন ঘটেছে। এর সঙ্গে সামাজিক ভাবধারারও অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

ভারতে মধ্যযুগে শক্তি-উপাসনার বিকাশ ঘটতে থাকে। শিবের পরাক্রমকে সার করেই এই শক্তির আরাধনা শুরু হয়েছিল। এই শক্তিপুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তন্ত্রবাদের মতো এক অতীন্দ্রিয় ও ঐন্দ্রজালিক রীতিনীতি। এই ধর্মাচার ছিল মূল হিন্দুধর্ম থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই তান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধর্মাচরণ সাধারণত অনার্য উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণের অনেকেই এই ধরণের ধর্মাচরণে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ এই তন্ত্রসাধকদের বিশেষ ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস করতেন। এই তান্ত্রিকরা শিব ও মহাকালরূপী কালীর পুজো করতেন বঙ্গদেশে। তবে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন দেবদেবীরা এই তন্ত্রসাধকদের দ্বারা পূজিত হতেন। তবে এই তন্ত্র সাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল অতীন্দ্রিয় শক্তিলাভের প্রয়াসে কঠোর সাধনা।

ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদের বিস্তর প্রভাব পড়তে থাকে। এই ভক্তিবাদের তাৎপর্য হলো যে দেবতাদের প্রতি ভক্তের উচ্ছ্বসিত ভালবাসা নিবেদন। এই সময়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্ষণশীলতা দক্ষিণ ভারতে ম্লান হয়ে পড়ে। এর ফলে দ্বাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যে লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ঘটে। এই লিঙ্গায়েতরা শিবের প্রতীক হিসেবে লিঙ্গের পূজা করতেন। এই লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বাসব ভক্তিবাদকে তন্ত্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করেন। সেই সঙ্গে জাতিভেদ প্রথার মতো হিন্দুধর্মের একটি অপরিহার্য নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি কঠোর তপস্যার ওপর জোর দেন এবং পূজার্চনা ইত্যাদির পরিবর্তে শিব দেবতাকে অন্তরের ভালবাসা জ্ঞাপনকে ধর্মের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে প্রচার করেন। গত বছর ভারতের রাজনীতিতে এই লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়কে আরক্ষণ দেওয়া নিয়ে ভোটব্যাঙ্কের এক নতুন রাজনৈতিক নাটক হয়ে গেল যা আমরা গত কর্ণাটক নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করলাম। তবে এই ধরণের বিভিন্নতা সারা ভারতেই হিন্দু সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

এই বৈচিত্র্য নিয়েই হিন্দুধর্ম টিকে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। হিন্দু সমাজ বহুকাল ধরে এই সমস্ত বৈচিত্র্যকে অঙ্গীভূত করেই চলে আসছে। সাধারণ ভাবে এই বৈচিত্র্যের মধ্যে আছে এক ধরণের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কার্ল মার্ক্স এই ধর্মাচরণকে আফিম হিসেবে বর্ণনা করলেও বাস্তবে মানুষ এই সব নিয়েই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পান। তাই ভারতে ধর্মাচরণের রীতিনীতি এতটাই বিভিন্নতায় ভরা যে মার্ক্সের বর্ণিত অর্থনৈতিক শ্রেণি বিভাগের মধ্যেও আরো অসংখ্য শ্রেণি বিভাগ আছে যা মানুষের নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে নিহিত হয়ে আছে। তাই মার্ক্সবাদকে ভারতীয় সমাজে গ্রহণযোগ্য করে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলতে হলে এর দেশজ সংস্করণ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় এই মতবাদ বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে। আমার এক মার্ক্সবাদী বন্ধু প্রায়ই বলে যে এখনও আমরা ভারতীয় সমাজকে বুঝে উঠতে পারি নি। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের এক চলমান সভ্যতার ধারাকে বুঝতে পারাটা এতটা সহজ কাজ অবশ্যই নয়।

পরিশেষে বলি কার্ল মার্ক্স যে ধর্মকে আফিম বলেছিলেন তা কিন্তু নেশা জাতীয় দ্রব্য অর্থে নয়। তিনি আফিমকে ব্যথা উপসমকারী ও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাদায়ী অর্থে এর ব্যবহার করেছিলেন। তিনি লিখেছেন ধর্ম হলো নিপীড়িত প্রাণীর দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয় এবং আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। এটা হলো জনগণের জন্য আফিম। জার্মান ভাষায় আফিমকে stimulant অর্থেও ব্যবহার করা হয়।

লক্ষ্মী-অলোক এবং ছপাক


-অভিষেক পাণ্ডে

প্রায় ৪ বছর আগে শ্রী সুমন্ত ভট্টাচার্য একটি লেখা লেখেন লক্ষ্মী অগ্রবালকে নিয়ে। তার সাথে একটা ছবিও ছিল, যার নীচে লক্ষ্মীর প্রেমিক অলোক দীক্ষিতের মহত্ত্বের বেশ গদগদ বর্ণনা ছিল। তখন অলোক বাবু আমার ফেসবুকের বন্ধু তালিকাতেই ছিলেন। আমি ওনাকে সেই পোস্টে ট্যাগ করায় উনি আমাকে মেসেজ করে জানান যে- “পাণ্ডে বাবু, আমাকে এসব সংঘী-দের পোস্টে ট্যাগ করবেন না”!

ঠিক তার পরের দিনই প্রেস ক্লাবে সুমন্ত বাবুর সাথে আমার দেখা হয়। শ্রীবাস্তব নামের কেউ একজন সেদিন ওর সাথেই ছিলেন। ভদ্রলোক বেশ সংবেদনশীল মানুষ। কথায় কথায় সুমন্ত বাবুর আগের দিনের পোস্টের ব্যাপারটা উঠল। হঠাৎ করেই শ্রীবাস্তব বাবু বললেন- “এই অলোককে আমার খুব ভাল ভাবে চেনা আছে। ভীষণ অসৎ চরিত্রের বামপন্থী ছেলে। আপনি দেখবেন, অলোক কোনদিনই লক্ষ্মীকে বিয়ে করবে না। ক বছর পরেই ছেড়ে দিয়ে পালাবে। যেই না মেয়েটা একটু বিখ্যাত হয়েছে, অমনি লাভের গুড় খাবার ধান্দায় এসে জুটেছে।” এই কথাগুলো শুনতে আমার খুব খুব খারাপ লেগেছিল। এসিডে মুখ ঝলসে যাওয়া একটা মেয়ের যে জীবনসঙ্গী হতে পারে, সেরকম সজ্জন একজন মানুষের নামে এমন কথা শুনলে, কারুরই হয়তো ভাল লাগবে না। কেন জানি না, আমার কানে শুধুই ধাক্কা মারছিল, একটা সাক্ষাৎকারে অলোক দীক্ষিতের নিজের বলা কয়েকটা কথা। “যতদিন বাঁচব, আমরা দুজন একসাথেই থাকব।”

অলোকের জন্ম হয় কানপুরে, ১৯৮৮ সালে। ও ২০০৭ এ ভারতীয় বিমান বাহিনীতে যোগ দিলেও ২০০৯ সালে ছেড়ে দেয়। তারপরে ভর্তি হয় “Indian Institute of Journalism & New Media , Bangalore” এ। সেখানকার পড়াশুনা শেষ হলে টিভি৯ চ্যানেলে সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করে। তারপর কাজ নেয় INEXT Live পোর্টালে। ২০১৩ র শেষের দিকে এসিড আক্রান্তদের একটি এনজিও-তে গিয়েই লক্ষ্মীর সাথে অলোকের প্রথম আলাপ হয়। আর কয়েক দিন যেতে না যেতেই ওরা দুজন একসঙ্গে থাকতে শুরু করে। ওদের মেয়ে পিহুর জন্ম ঠিক দুবছরের মধ্যে, ২০১৫ তে।

একটা কাগজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অলোক বলেছিল- “যেভাবে একজন সাধারণ মানুষ আরেকজনের প্রেমে পড়ে, লক্ষ্মীর সাথে আমার প্রেমকাহিনী ঠিক সেভাবেই এগিয়েছে।” তারপরে আরো ও এটাও বলেছিল যে- “জীবনের শেষ পর্যন্ত লক্ষ্মীর সাথে কাটাতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু শুধু বিয়ে না করার জন্য আমাদেরকে সামাজিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু আমি সত্যিই চাই না যে আমাদের বিয়েতে লোকে আসুক আর লক্ষ্মীর রূপ নিয়ে উল্টোপাল্টা কেচ্ছা করুক। বিয়েতে তো লোকে কনের রূপটাই দেখে, তাই আমরা কখনো বিয়ে করব না বলেই ঠিক করেছি।” পরে অবশ্য দুজনের পরিবার থেকেই এই সম্পর্কের সম্মতি দিয়ে দেওয়া হয়।

অসীম ত্রিবেদীকে সাথে নিয়ে “Save your voice” নামে সংস্থা খোলে অলোক। অসীম ত্রিবেদীর পরিচয় দিলে হয়তো অনেকেই চিনবেন। ফেসবুক এবং টুইটারে এনার “Cartoons Against Corruption” নামক কার্যক্রম বেশ বিখ্যাত। ইনি “আম আদমি পার্টি”-রও প্রচারের কাজ করে থাকেন। এমন গুণধর দুই ব্যক্তি মিলে কোন সংস্থা খুললে, সেখানে “টুকরো টুকরো গ্যাং”-এর চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি।

মেয়ে পিহু-র জন্মের কয়েক মাস পরেই অলোক আর লক্ষ্মীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এবং মেয়ের ভরণ-পোষণ বাবদ এক পয়সাও খরচ দিতে রাজি হয়নি। এমন কি একথা খোলাখুলি স্বীকার করে ও জানিয়েছে যে- “he has not been able to provide any financial assistance to her or the child” …. তাহলে এতরকম কাজে এত অভিজ্ঞতা জমিয়ে লাভ কি হল? যদি আপনি ওর প্রোফাইলটা খুব খুঁটিয়ে পড়েন, হয়তো আপনারও আশ্চর্য লাগবে যে এত উচ্চ-শিক্ষিত একটা লোক কি কারণে নিজের বউ-বাচ্চার জন্য টাকার জোগাড় করতে পারছে না? বামপন্থী চরিত্রগুলো ঠিক এইরকমই। এদের কাছে পারিবারিক মূল্যবোধের কোন দাম নেই। শুধু আরাম-আয়েশের জীবন পেলেই এরা খুশি।

২০১৫ তে ছাড়াছাড়ি হবার পর অলোক নানান অজুহাতে লক্ষ্মীকে এনজিও থেকে তাড়িয়ে দেয়। ফলে এনজিওর কাজ বাবদ লক্ষ্মী মাসে মাসে যে ১০,০০০/- টাকা করে পাচ্ছিল, সেই রোজগারটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। তারপর তিন বছর একটা প্রাণান্তকর সংগ্রাম করতে হয়েছিল মেয়েটাকে। কোলে বাচ্চা নিয়ে সম্পুর্ন একা একটা শহরে ঘর ভাড়া আর পেটের ভাত জোটানোটা দুষ্কর হয়ে উঠেছিল। ওই পোড়া মুখের জন্য বেচারীকে কেউ চাকরি দিতে রাজি ছিল না। এমন কি কল সেন্টারগুলোতে আবেদন করেও কোন লাভ হয়নি। কল সেন্টারের গ্রাহকরা কর্মীদের মুখ এমনিতেও দেখতে পায় না, শুধুমাত্র গলার আওয়াজ শোনে। তবুও লক্ষ্মীর জন্য চাকরির দরজাগুলো এক ইঞ্চিও খোলেনি। তারই মধ্যে ঘনিয়ে এল আরেক বিপদ। যেই বাড়িটায় মা-মেয়েতে ভাড়া থাকত, সেই বাড়ির মালিকের বাচ্চারা নাকি লক্ষ্মীর মুখ দেখে আঁতকে উঠত। তাই হুকুম জারি হল, অবিলম্বে ওদেরকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।

লক্ষ্মীর ব্যাপারে কিভাবে যেন জানতে পেরেছিলেন অক্ষয় কুমার। উনি পাঁচ লাখ টাকা সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরো কিছু অর্থ সাহায্য এসেছিল যেগুলো দিয়ে আরো কিছু এসিড আক্রান্তের সাথে মিলে লক্ষ্মী একটা ক্যাফে খোলে। কানপুর আর লখনৌ-তে সেই ক্যাফের দুটো শাখা।

লক্ষ্মীর খারাপ আমি কখনোই চাইব না। ওর লড়াইটাকে আমি প্রচন্ড সম্মান করি। ভগবান করুন পিহুকে নিয়ে ও যেন আজীবন সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে। তিন বছর আগে যখন লক্ষ্মীর আর্থিক দুরবস্থার কথা জানতে পারি, ভীষণ ইচ্ছা ছিল কিছু সাহায্য করার। কিন্তু সেটার রাস্তাটা জানা ছিল না। ভবিষ্যতে আশা করি সেই সুযোগ অবশ্যই হবে।

আমার এই লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য হল, বামপন্থীদের শঠতার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। তারাই বামপন্থী যারা দেশ, দারিদ্র্য, সমাজ, ন্যায়, সাংবিধানিক মূল্যবোধের কথা জোর গলায় বলে অথচ নিজের ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রায় কিছুই মেনে চলে না। যে লোকটা নিজের অসহায় স্ত্রী-সন্তানকে অনাহারে রেখে পালিয়ে যেতে পারে; তার কাছ থেকে যদি আপনি গরিব-অসহায়দের প্রতি সত্যিকারের সহানুভূতি আশা করেন, তাহলে আপনার থেকে বড় বোকা আর কেউ নেই।

বামপন্থার আসল মুখ এইটাই। শ্রীবাস্তব বাবু বোধ হয় সেদিন ঠিকই বলেছিলেন- “অলোক অসৎ চরিত্রের বামপন্থী ছেলে। দেখবেন, মেয়েটাকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।”

(তথ্য এবং মতামত সম্পূর্ণ ভাবেই লেখকের নিজস্ব।)

ইরান-মার্কিন সংঘর্ষ; ভারতের স্বার্থ কোনদিকে

রজতকান্তি দাশ

ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধে ভারত হয়ত চাবাহার পোর্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। আফগানিস্তানের বমিয়ান অঞ্চলে বিশাল ইস্পাত কারখানা তৈরি হতে চলেছে যার জন্য সাতটি ভারতীয় ব্যবসায়ী কোম্পানির সঙ্গে আফগানিস্তানের চুক্তি হয়েছে। এই কোম্পানিগুলো লিজ নিয়ে ইস্পাত তৈরি করবে এবং এই ইস্পাত ভারত সহ সারা বিশ্বে বাজারজাত করা হবে। এতে করে বিপুল সংখ্যক ভারতীয়দের কর্ম সংস্থানেরও সুযোগ রয়েছে। সরাসরিভাবে হাজার হাজার ভারতীয়দের চাকরি হবে এই ইস্পাত কারখানায় যার জন্য ভারত সরকার এর ব্যবসায়িক দিকটিকে খতিয়ে দেখছে। অন্য অনেক ভাবেই লক্ষ লক্ষ ভারতীয়দের কর্ম সংস্থানের সুযোগ রয়েছে এই ইস্পাত কারখানাকে কেন্দ্র করে। এছাড়া নানাভাবে কর আদায় করা হবে এই কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে। তাছাড়া ভারতের আর্থিক বিকাশের জন্যও এই ইস্পাতের একান্ত প্রয়োজন।

সমস্যাটা হলো যে ১০০ ট্রিলিয়ন টন রিজার্ভের লৌহ আকর সম্পন্ন এই কারখানার উৎপাদনকে বাজারজাত করার জন্য সমুদ্র বন্দরের প্রয়োজন। তাই নরেন্দ্র মোদী নয়াজ শরিফের জন্মদিনে পাকিস্তানে গিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে চেয়েছিলেন যদি করাচী কিংবা গোয়াদার পোর্ট ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু পাকিস্তানকে ভরসা নেই। ২০১৫ সালেই তাই ইরানের সঙ্গে ভারতের চাবাহার চুক্তি সম্পন্ন হয়ে পড়ায় এখন আর পাকিস্তানের উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। ইরানের চাবাহার থেকে আফগানিস্তানের বমিয়ান পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্যও ইরানের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেছে ভারত। এখন বমিয়ান থেকে উৎপাদিত ইস্পাত সরাসরি আফগানিস্তান থেকে ইরানের চাবাহার পোর্ট পর্যন্ত চলে আসবে। এই গভীর সমুদ্র পোর্ট নির্মাণের চুক্তির ফলে চীন ও পাকিস্তানের ৪৬ বিলিয়ন ডলারের গোয়াদার পোর্ট নিয়ে যে বিশাল পরিকল্পনা আছে তাতে অনেকটাই ঠাণ্ডা জল পড়ে গেছে। এই নিয়ে চীন থেকে বালুচিস্তানের মধ্য দিয়ে গোয়াদার পোর্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজও দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে নির্মীয়মান চাবাহার পোর্ট নিয়েই উৎসাহ বেশি। ভারত ও ইরানের এই চুক্তিতে আমেরিকা অত্যন্ত অখুশি। কয়েকবার ধমকিও দিয়েছে। কিন্তু তাতে কি। মনমোহন সিঙের সরকারও ইরানের উপর আমেরিকার আর্থিক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ঐ দেশ থেকে তেল কিনে তাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়েছিল। সেই থেকেই ভারত ও ইরানের সম্পর্ক মজবুত হয়েছিল। মোদী এই সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন।

বমিয়ানের ইস্পাত ছাড়াও চাবাহার সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে সামগ্রিকভাবে ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। এমন কি সমগ্র পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ভারতের পণ্য রপ্তানিতে বড় ভূমিকা পালন করবে এই চাবাহার পোর্ট। ইতিমধ্যে এই পোর্ট দিয়ে এক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করে ফেলেছে ভারত। কিন্তু ইরান যদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে এই চাবাহার পোর্টে হয়ত বোমাবর্ষণ করতে পারে আমেরিকা। ইতিমধ্যে নির্মাণের কাজে অনেকটা অর্থ ব্যয় হয়েছে ভারতের। এছাড়া ইরানের সঙ্গে ভারতীয় মূদ্রায় তেল কেনার চুক্তি করেছে ভারত। এর ফলে বিদেশি মূদ্রার সাশ্রয় তো আছেই। সেই সঙ্গে ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রবল। কারণ ইরানকে এই টাকায় ভারত থেকেই পণ্য ক্রয় করতে হবে। ইরান ভারতের বন্ধু দেশ। তাই ইরান কোনভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক এটা আমাদের মোটেই কাম্য নয়।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থা

অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

ঊনবিংশ শতক বাঙ্গালী জীবনে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা বাঙ্গালী মহাপুরুষ বলতে মূলত যাঁদের বুঝি তাঁদের প্রায় সকলেরই জন্ম এই শতকে। কিন্তু এই শতকেই কিছু ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালী পাশ্চাত্ত্যের অন্ধ অনুকরণে ব্রতী হয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে যারা পাশ্চাত্ত্যের দর্শন-ইতিহাস থেকে শেখার পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ধর্ম থেকেই ভারতীয়দের আত্মশক্তি অর্জন করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত বলে মনে করতেন তাঁদের পুরোধা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠী তাঁর The Extremist Challenge গ্রন্থে (যার বাংলা অনুবাদ হল ভারতের মুক্তিসংগ্রামে চরমপন্থী পর্ব) ভারতীয় রাজনীতিতে চরমপন্থী মতবাদের ভাবগত পটভূমি তৈরীর পিছনে তিনজন ব্যক্তিত্বের ভূমিকার কথা বলেছেন – বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দ সরস্বতী। Charles Himesath তাঁর The Indian Nationalism and Hindu Social Reform গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য-কৃতির মধ্যেই চরমপন্থী রাজনৈতিক আদর্শের উৎস আবিষ্কার করেছেন। বহু ইউরোপীয় ও ভারতীয় পণ্ডিতও একই মনোভাব পোষণ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্বাস করতেন যে, বিদেশ থেকে আমদানী করা কোন তত্ত্ব নয়, এ দেশের আবহাওয়া, মানুষের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্যই তার ভিত্তি হতে পারে।

বঙ্কিমচন্দ্রের বিভিন্ন লেখালেখি কিভাবে জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থার আদর্শগত উৎস হিসাবে কাজ করেছিল- এবার সেগুলোই একটু দেখা যাক।

কৃষ্ণচরিত্রঃ বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র প্রকাশিত হবার পর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় শ্রীকৃষ্ণই হয়ে ওঠেন চরমপন্থী মাত্রেরই আদর্শ পুরুষ। বঙ্কিমের কৃষ্ণ হলেন গীতার শ্রীকৃষ্ণ। যিনি বলেন

‘‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুথানধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।।’’

এই শ্রীকৃষ্ণ অতি দূরে সরে থাকা, নির্লিপ্ত ঈশ্বর নন। তিনি ধর্ম সংস্থাপনের জন্য দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের কাজে সদা তৎপর। শ্রীকৃষ্ণের গুণাবলীর মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন তাঁর অতুলনীয় নেতৃ-প্রতিভার ওপর, তাঁর সামরিক জ্ঞান ও সাম্রাজ্য সংগঠনী কুশলতার ওপর। শ্রীকৃষ্ণ স্বপ্ন দেখেছিলেন এক ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষের, আর এই স্বপ্নকে পূরণ করার জন্যই কুরুক্ষেত্রে অগণিত ক্ষুদ্র সামন্ত রাজাকে বিনাশ করে এক সুবিশাল, সংহত ধর্মরাজ্য সৃষ্টি করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, বঙ্কিমচন্দ্রের এই ধর্মরাজ্যের সঙ্গে প্রতীচ্যের পররাজ্যলিপ্সু উগ্র জাতীয়তাবাদের কোন সাদৃশ্য ছিল না।

বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র প্রকাশিত হবার পর তিলক রচনা করলেন গীতার মারাঠি ভাষ্য, অরবিন্দ লিখলেন গীতার দীর্ঘ ভূমিকা, লাজপৎ রায় উর্দু ভাষায় শ্রীকৃষ্ণের জীবনী প্রণয়ন করলেন, ভক্তিযোগের ব্যাখ্যা লিখলেন অশ্বিনী কুমার দত্ত, ব্রাহ্ম বিপিনচন্দ্র পাল শ্রীকৃষ্ণকে ‘ভারত-আত্মা’ হিসাবে অভিহিত করেন, এমনকি ক্যাথলিক ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় লিখে ফেললেন – শ্রীকৃষ্ণতত্ত্ব। এতটাই ছিল বঙ্কিমের কৃষ্ণ চরিত্রের প্রভাব।

ধর্মতত্ত্ব (অনুশীলন): বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্ব (অনুশীলন) গ্রন্থের আদর্শে ও এর নাম অনুসারে বঙ্গের সবথেকে খ্যাতনামা বিপ্লবী সমিতি ‘অনুশীলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০২-এ। অনুশীলন সমিতির বিশিষ্ট বিপ্লবী জীবনতারা হালদার তাঁর অনুশীলন সমিতির ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন যে ‘‘ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের অনুশীলন তত্ত্বে শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সমন্বিত আদর্শ মানব গঠনের যে নির্দেশ আছে তাহাই হইল অনুশীলন সমিতির ভিত্তি।’’

আনন্দমঠ ও বন্দেমাতরম্ঃ আনন্দমঠ ও বন্দে মাতরম্ হল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের সবচেয়ে বড় অবদান। আনন্দমঠ উপন্যাসে ভবানন্দ সর্বপ্রথম মহেন্দ্রকে ‘বন্দে মাতরম্’ গেয়ে শোনান। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় আনন্দমঠ লেখা হয়েছিল। দেশকে দেশমাতৃকা রূপে দেখান এখানে বঙ্কিমচন্দ্রের সবথেকে বড় কৃতিত্ব।

এই উপন্যাসে আমরা দেখি ব্রহ্মচারী সত্যানন্দ মহেন্দ্রকে বিভিন্ন যুগে দেশমাতৃকার নানা রূপ দেখাচ্ছেন। প্রথমে ব্রহ্মচারী মহেন্দ্রকে দেখাচ্ছেন, এক অপরূপ সর্বাঙ্গসম্পন্না, সর্বাঙ্গবরণভূষিতা জগদ্ধাত্রী মূর্তি। মহেন্দ্র তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে ব্রহ্মচারী সর্বানন্দ বললেন, ‘‘মা যা ছিলেন’’। তারপর ব্রহ্মচারী কক্ষান্তরে মহেন্দ্রকে নিয়ে গিয়ে দেখালেন মা কালীর মূর্তি। বললেন ‘‘দেখ, মা যা হইয়াছেন।…… কালী- অন্ধকারসমাচ্ছন্না, কালিমাময়ী। হৃতসর্বস্বা, এই জন্য নগ্নিকা। আজি দেশের সর্বত্রই শ্মশান তাই মা কঙ্কালমালিনী।’’ তারপর ব্রহ্মচারী সত্যানন্দ মহেন্দ্রকে দেখালেন মর্ম্মর প্রস্তর নির্মিত একটি মন্দিরের মধ্যে সোনার তৈরী দশভুজা দুর্গা প্রতিমা। ব্রহ্মচারী মহেন্দ্রকে বললেন, ‘‘এই মা যা হইবেন। দশভুজ দশ দিকে প্রসারিত, তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত, পদতলে শত্রু বিমর্দিত, পদাশ্রিত বীরকেশরী শত্রু নিপীড়নে নিযুক্ত, দিগভুজা, নানা প্রহরণধারিণী, শত্রুবিমর্দিনী বীরেন্দ্র পৃষ্ঠবিহারিণী, দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরুপিণী, বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞানদায়িনী, সঙ্গে বলরুপী কার্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরুপী গণেশ।’’ মহেন্দ্র ব্রহ্মচারীকে জিজ্ঞাসা করল যে, মায়ের এই মূর্তি কবে দেখতে পাব? উত্তরে ব্রহ্মচারী সত্যানন্দ বললেন, ‘‘যবে মার সকল সন্তান মাকে মা বলিয়া ডাকিবে, সেইদিন উনি প্রসন্ন হইবেন।’’

এখানে বিভিন্ন দেবীমূর্তির কথা বলে বঙ্কিমচন্দ্র বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষের অবস্থা বোঝাতে চেয়েছেন। প্রথমে স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা জগদ্ধাত্রী হচ্ছেন প্রাচীন সমৃদ্ধশালী ভারতবর্ষের প্রতীক। তারপর নগ্নিকা, হৃতসর্বস্বা, শ্মশানচারিণী মা কালী মুসলিম ও ব্রিটিশ আমলে অত্যচারিতা, লুণ্ঠিতা, পরাধীনা দেশমাতৃকার প্রতীক। এরপর লক্ষ্মী-সরস্বতী-গণেশ-কার্তিক সহ স্বর্ণনির্মিত দশভুজা দুর্গা মূর্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতবর্ষের এক প্রতিচ্ছবি অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন বঙ্কিম। 

ঋষি অরবিন্দের ভাষায় বন্দেমাতরম্ ধ্বনি এক নতুন ধর্মের জন্ম দিল, যা হল দেশপ্রেমের ধর্ম। বঙ্কিমচন্দ্র ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, একদিন দেখিবে এই গানে বঙ্গদেশ মাতিয়া উঠিবে। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। ১৯০৫ থেকেই বঙ্গসমেত সারা ভারতবর্ষে বন্দেমাতরম্ দেশপ্রেমের মন্ত্র। স্বাদেশিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। অনুশীলন সমিতির আদর্শের অন্যতম উৎসও হয়ে দাঁড়ায় আনন্দমঠ ও বন্দেমাতরম্।

বঙ্কিমের ইতিহাস চেতনাঃ বঙ্কিমচন্দ্র ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ প্রবন্ধে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘‘সাহেবরা যদি পাখি মারিতে যান, তাহারও ইতিহাস লিখিত হয়, কিন্তু বাঙ্গালার ইতিহাস নাই।’’ বঙ্কিম বুঝেছিলেন সঠিক ইতিহাস-জ্ঞান একটি জাতির উত্থানের জন্য আবিশ্যিক। আর মিথ্যা, বিকৃত ইতিহাস যে একটি জাতিকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দিতে পারে তাও তিনি বুঝেছিলেন। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘‘ঐতিহাসিক গবেষণায় বঙ্কিমচন্দ্র’’ প্রবন্ধে ইউরোপে যখন বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস-চর্চার শৈশবাবস্থা এবং বঙ্গে যখন ইতিহাসচর্চা প্রায় শুরুই হয়নি বলা যায়, সেই সময় বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস-চেতনা ও ইতিহাস-লেখনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বঙ্কিম মিনহাজ উস সিরাজের তবকৎ-ই-নাসিরী-তে প্রাপ্ত বখতিয়ার খলজীর সপ্তদশ অশ্বারোহী নিয়ে বঙ্গ-বিজয়ের কাহিনিতে কোনদিনই বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘‘সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া বখতিয়ার খিলিজি বাঙ্গালা জয় করিয়াছিল, একথা যে বাঙ্গালীতে বিশ্বাস করে, সে কুলাঙ্গার।’’ তিনি এই ঘটনাকে অসম্ভব বলে মনে করেন এবং বখতিয়ার যে  বঙ্গের খুব কম অংশকেই দখল করতে পেরেছিলেন, তাও উল্লেখ করেন। বর্তমানে আমরা জানি যে বঙ্কিমের দাবী ঐতিহাসিকভাবে সত্য। বখতিয়ার শুধু কয়েক বছরের জন্য বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবঙ্গের কিছু অংশ দখলে রাখতে পেরেছিলেন। বাকি উভয় বঙ্গের অধিকাংশ অঞ্চলই লক্ষ্মণ সেনের পুত্র বিশ্বরূপ সেন, কেশব সেন-সহ তাঁর উত্তরাধিকারীরা বহু বছর যাবৎ শাসন করেন। মৃণালিনী উপন্যাসেও বঙ্কিম বখতিয়ার-সংক্রান্ত কিংবদন্তিটির বিরোধিতা করেছেন।

বঙ্কিমচন্দ্র কি মুসলমান-বিরোধী ছিলেন? কিছু গবেষক বঙ্কিমকে মুসলমানবিরোধী, সাম্প্রদায়িক হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বঙ্কিম নিজেই ‘বঙ্গদর্শন’-এ ১২৮০ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যায় লিখেছেন যে, ‘‘বাঙ্গালা হিন্দু-মুসলমানদের দেশ, একা হিন্দুর দেশ নহে।’’ ১৯৩৮-এ বঙ্কিম জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় রেজাউল করীমের প্রকাশিত প্রবন্ধগুলি সংকলন আকারে ১৯৪৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। মুসলিম লীগের প্ররোচনায় কলকাতার রাস্তায় শত শত কপি আনন্দমঠ পোড়ানোর প্রতিবাদ করে রেজাউল করীম লেখেন, ‘‘আনন্দমঠকে অগ্নিদগ্ধ করিয়া ইহারা যে মনোবৃত্তির পরিচয় দিলেন তাহা অতীব জঘন্য। স্বাধীন চিন্তার পথ রুদ্ধ করিবার করিবার জন্য এই যে প্রচেষ্টা, ইহা ইসলামকে উদ্ধার করিবে না। ইহা লইয়া যাইবে মুসলমানকে অধঃপতনের দিকে……  ভূলুণ্ঠিত হইল মুসলমানের স্বাধীন চিন্তার শক্তি….।’’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘‘আজ আনন্দমঠের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন আরম্ভ হইয়াছে, তাহা মুসলমানদের অভাব-অভিযোগ দূর করিবার উদ্দেশ্যে নহে। তাহার মূল কারণ মুসলমান যাহাতে মুক্তি আন্দোলনে যোগ দিতে না পারে তাহার জন্য কতকগুলি ছল বাহির করিবার দুরভিসন্ধি।’’ বন্দেমাতরম প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘‘অন্যান্য দেশের মুসলমানরা এরূপ গান ব্যবহার করিবার মত পরিস্থিতি পাইলে ধন্য হইয়া যাইতেন। তাই তাঁর মতে বঙ্কিমের নিকট যদি বাঙ্গালী ঋণী হয়, বাংলা ভাষা ঋণী হয়, তবে বাঙ্গালী মুসলমানও সমভাবে তাঁহার নিকট ঋণী, সর্বাংশে ঋণী।’’

রেজাউল করীম দেখাচ্ছেন যে, বঙ্গজননীর সপ্তকোটি সন্তানকেই বঙ্কিম স্বাধীনতার সংগ্রামে আহ্বান করছেন। তিনি বলেছেন, বন্দেমাতরম কোন হিন্দু দেবদেবীর পূজার গান নয়। এখানে দেশকে বন্দনা করা হয়েছে। তাকে কোথাও এবাদৎ বা সেজদা করতে বলা হয়নি। এই বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার। সেখানে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও বন্দেমাতরম্কে ইসলামবিরোধী সাজানোর মুসলিম লীগের চক্রান্তের বিরোধিতা করেছেন।

ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠী লিখেছেন, ‘‘বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনী কখনোই সৎ মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেনি। তাঁর রচনায় নিন্দিত হয়েছিলেন কেবলমাত্র অত্যাচারী বা অপদার্থ মুসলমান শাসকবর্গ। তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনা চলত যদি তিনি আকবর বা হুসেন শাহের মত কোন সুশাসকের কুৎসা করতেন।’’ পশুপতি, ভবানন্দ, গঙ্গারাম, সীতারাম প্রভৃতি হিন্দু চরিত্রের খারাপ দিকও তিনি তুলে ধরেছেন।

বঙ্গদেশের কৃষকঃ বঙ্কিমচন্দ্র নিজ দেশীয় ঐতিহ্য, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ প্রভৃতির ওপর জোর দিলেও কিছু বামপন্থী বা অতিবামপন্থী যেভাবে তাঁকে ব্রাহ্মণ্যবাদী, মনুবাদী বা এলিটিস্ট হিসাবে দাগানোর অপচেষ্টা করেন তা কখনই ঠিক নয়। কারণ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর ও বর্ণের কথা আমরা তাঁর লেখায় পাই। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ তাঁর লেখা প্রবন্ধ ‘বঙ্গদেশের কৃষক’। এই প্রবন্ধে তিনি বঙ্গের কৃষকদের দুরবস্থার কথা লিখেছেন। তৎকালীন সমাজের অধিকাংশ বিশিষ্ট ব্যক্তিই যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রশংসায় পঞ্চমুখ- তখন তিনি এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে কলম ধরেছিলেন। মনে রাখতে হবে যে, বঙ্গদেশের কৃষকদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান এবং বাকীরা তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু। কিন্তু এদের জন্যই বঙ্কিম কলম ধরেছিলেন।

চরমপন্থার উদ্ভবে বঙ্কিমচন্দ্রঃ কংগ্রেসের নরমপন্থীদের নীতি ও কর্মপন্থার তীক্ষ্ণ সমালোচনা করে বঙ্কিমচন্দ্রই চরমপন্থার উত্থানের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। কমলাকান্তের দপ্তরে ‘পলিটিকস্’ রচনায় তিনি কমলাকান্তের মুখ দিয়ে নরমপন্থীদের সমালোচনা করে বলিয়েছিলেন, ‘‘জয় রাধে কৃষ্ণ! ভিক্ষা দাও গো! ইহাই আমাদের পলিটিকস্।’’ তিনি এই প্রবন্ধে কলুর পুত্র সংক্রান্ত একটি গল্পে নরমপন্থীদের রাজনীতিকে ‘কুক্কুর জাতীয় রাজনীতির’ সঙ্গে তুলনা করেন এবং এর পরিবর্তে ‘বৃষ জাতীয় রাজনীতি’ গ্রহণ করার কথা বলেন।

এহেন বঙ্কিমচন্দ্র, যিনি শুধু সাহিত্যসম্রাট এবং বাংলা সাহিত্যের ভগীরথই নন, তাঁর রচনার সামাজিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক গুরুত্বও ছিল অপরিসীম। বঙ্গ তথা ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের উত্থানের পিছনে তাঁর রচনাগুলি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু তিনি কি তাঁর যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছেন? তাঁর এই অবদানগুলোকে নিয়ে কি যথেষ্ট চর্চা হয়েছে? ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের উদগাতা ঋষি বঙ্কিমকে শুধুমাত্র নৈহাটির বঙ্কিম করে রাখার প্রয়াস কি ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত? পাঠকদের ওপরই তা বিচারের ভার থাকল।     

(‘যুগশঙ্খ’ সংবাদপত্রের উত্তর-সম্পাদকীয় বিভাগে ১৫.০৯.২০১৯-এ লেখকের ‘পরাধীন ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং বঙ্কিমচন্দ্র’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধটি তারই একটি পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ।)

কমিউনিস্ট রাজনীতি মানেই কি ইসলামী এজেন্ডা পূরণের রাজনীতি?

শীতাংশু গুহ

ফেইসবুকে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পাৰ্টিকে আমি ‘বাংলাদেশ মুসলিম কমিউনিষ্ট পার্টি’ নাম দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। ঢাকার মির্টফোর্ড থেকে পাশ করা ডাক্তার প্রলয় ভট্টাচার্য্য যিনি এখন কোলকাতায় প্র্যাকটিস করেন, এর উত্তরে লিখেছেন, পূর্ব বাংলার হিন্দুদের উদ্বাস্তু হবার যন্ত্রনায় কমিউনিষ্টদের অবদান অনেক। প্রলয় ভট্টাচার্য্য একদা সিপিবি করতেন। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান আন্দোলনে তিন রকম গোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল। এরা হলো, মুসলিম লীগ, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি। কমিউনিষ্ট ও মুসলমানরা আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকারের নামে পাকিস্তান সৃষ্টিকে সমর্থন করেছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর দীর্ঘ দিন ভারত ও পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি পৃথক হয়নি। বরং এক পার্টি হিসেবে কাজ করেছিল। এই সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ছিলেন বি. টি. রণদিভে‌। কমিউনিস্ট পার্টি তখন ডাক দেয়, “ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়, লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়।” এই স্লোগান দিয়ে তারা কৃষকদের নিয়ে তেভাগা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই স্লোগান ও আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সরকার পুরোপুরি কাজে লাগায়। সাধের পাকিস্তানের ‘আজাদী ঝুটা হ্যায়’ সরকার তা মানতে পারেনা, তারা কমিউনিষ্টদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ঐসময়, দু’একজন বাদ দিলে কমিউনিষ্ট মানেই হিন্দু, সুতরাং সরকারের রোষ পড়ে হিন্দুর ওপর, একে হিন্দু, তায় কমিউনিষ্ট, দুই অপরাধ? তেভাগা আন্দোলনে কমিউনিষ্টদের প্রভাবটাও ছিল মূলতঃ হিন্দু কৃষকদের ওপর। ফলে সরকারের এই আক্রমণ খুব সহজেই নতুন পাকিস্তানের সাধারণ মুসলমানদের সমর্থন লাভ করে। হিন্দু কমরেডরা অনেকেই তখন রাতের অন্ধকারে ভারতে পালিয়ে যান। হিন্দু কৃষকরা যারা এইসব নেতাদের পেছনে আন্দোলন করতেন, নেতা পালিয়ে যাওয়ায় তারাও পালিয়ে যান? তাই বলা যায়, পূর্ব-পাকিস্তান থেকে হিন্দু বিতরণে কমিউনিষ্টদের অপরিণামদর্শী রাজনীতিও কিছু কম দায়ী নয়। এ কথা ভুললে চলবে না যে শত দমন পীড়ন সহ্য করেও কিউবা, ভিয়েতনাম, চীনের কমিউনিষ্টরা কিন্তু মাটি কামড়ে লড়াই করেছেন, দেশ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাননি।

পরবর্তীতে পার্টির সিদ্ধান্ত হলো কলকাতা থেকে কিছু মুসলমান কমরেড পাকিস্তান যাবেন এবং সেখানে পার্টি গড়ে তুলবে। এদের মধ্যে ছিলেন মনসুর হাবিবুল্লাহ, আবদুল হালিম-এর মত পোড় খাওয়া কমিউনিষ্টরা। রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চলার পর হাবিব সাহেব পাকিস্তান সরকারকে বন্ড সই করে দেন যে তিনি আর কখনো সেখানে আসবেন না এবং জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভারতে চলে যান। বাকিদেরও প্রায় একই পরিণতি হয়েছিল। বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির এক সময়ের সভাপতি আহসানউল্লাহ হটাৎ করে একদিন হজ্ব করে এলেন। বস্তুবাদী দর্শন শিকেয় তুলে অনেক বাম নেতা তখন হজ্ব করেন। কমিউনিষ্টরা ভাববাদী দর্শনের বিরোধিতা করে ধর্মকে আফিম বলে অভিহিত করে থাকেন, কিন্তু নেতারা যখন হজ্ব করেন এবং ধর্মকে নিজের জীবনে প্রয়োগ করেন, তখন কমিউনিষ্ট পার্টির অবস্থা বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়?

পলাশ ভট্টাচার্য্য নামে অন্য একজন লিখেন, “আমি মনে করি ভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতি হচ্ছে মার্কসবাদের আড়ালে ইসলামী এজেন্ডা পূরণের রাজনীতি।” অলোক ভট্টাচার্য্য লিখেছেন, “শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য আমার বাবা। প্রলয় আমার ছোট ভাই। দু’জনেই কলকাতাবাসী।” তিনি বলেন, “‘স্বাধীনতা সংগ্রামী চরিতাভিধান’ বইটিতে শ্যামেন্দ্রবাবুর কারাজীবন চব্বিশ বছর বলে উল্লেখিত আছে”। অলোক ভট্টাচার্য্য বলেন, “উনসত্তরে আমি ভারতে চলে যাই।” তিনি আরো জানান, তার বাবা শ্যামেন্দ্রবাবু ছিলেন বোয়ালমারি জর্জ একাডেমীর প্রধান শিক্ষক, আইয়ুব খান তাঁকে বরখাস্ত করেন। অলোক ভট্টাচার্য্য জানান, শ্যামেন্দ্র ভট্টাচার্য্য তেভাগা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিলেন, যদিও পার্টির সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেন। তার বক্তব্য ছিলো তেভাগা আন্দোলন হলে প্রচন্ড সরকারী রোষ নেমে আসবে, যা সামাল দেয়া কঠিন হবে; কমিউনিষ্টদের ভারতের দালাল বলে আখ্যায়িত করা হবে এবং মানুষ আর বাম-আন্দোলন করতে চাইবেনা। তার কথা ঠিক হয়েছিলো। তেভাগা আন্দোলন ব্যর্থ হয়, নেতারা ভারতে পাড়ি জমান। যদিও, অমূল্য লাহিড়ি, শান্তি সেন, সমর সেন, আশু ভরদ্বাজ, বরোদা চক্রবর্তী এবং আরও দু’একজন নেতা মাটি কামড়ে দেশেই থেকেছেন। তাদেরই একজন সত্য মৈত্র এখনও জীবিত (২০১৮) এবং সাতানব্বই বছর বয়সে ঢাকাতে অসুস্থ । তিনি জানান, সত্য মৈত্র সম্পর্কে ২০১১ সালে ঢাকার একটি সংবাদপত্রে আমার একটি লেখা বেরিয়েছিল।

তাঁর জীবন নিয়ে একটি সম্পূর্ণ বই লেখা যায়। শুনেছি, রাজবাড়ির বাবু মল্লিক ও শীবেন কুন্ডু সেই চেষ্টা চালাচ্ছেন। অলোক ভট্টাচার্য্য আরো লিখেছেন, ভারতে এসে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হন, তার কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার কথাটি সঠিক নহে। শ্যামেন্দ্রবাবুর পুত্রদের আমি বলেছি, আপনাদের কথার বাইরে আমি যেটুকু তথ্য দিয়েছি, তা ওয়েব থেকে নেয়া, সেখানে লেখা আছে তিনি ভারতে গিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন? গুগুলে আপনার বাবা নাম টাইপ করলে আরো কিছু জানতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে নারায়ণ দেবনাথ জানান যে, দৈনিক সংবাদের সম্পাদক প্রয়াত আহমুদুল কবির কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতি করতেন, তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলার আসামী হেলাল রাজাকারকে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। এটা হচ্ছে কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতি? নারায়ণবাবুকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, আমি আহমদুল কবিরকে চিনতাম, কারণ ১৯৭৯-৮১, প্রায় তিন বছর আমি দৈনিক সংবাদে সাংবাদিক ছিলাম। আপনার বর্ণিত ঘটনা অনেকে জানেন, আমার ভুল না হলে, কার্তিক চ্যাটার্জী তার এলাকার লোক, তিনিও সংবাদে চাকুরী করতেন। আহমদুল কবিরকে আপনি ‘ভদ্রলোক কমুনিস্ট’ বলতে পারেন। সর্বশেষ বলতে চাই, বাংলাদেশের বামরা বিভ্রান্ত। মনি সিং-ফরহাদ’র পর বিভ্রান্ত বেড়েছে বহুগুন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সত্তর বছরের কমিউনিষ্ট শাসনে মুসলমানরা কমিউনিষ্ট হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম শাসনেও নয়। মুসলমান কমিউনিষ্ট হয়না (সামান্য ব্যতিক্রম আছে), বাংলাদেশেও তাই; ইসলাম সামনে এসে দাঁড়ালে বাংলাদেশী কমিউনিষ্টও ‘মুসলমান’ হয়ে যায়?

টলিউড-বলিউডে সাংস্কৃতিক জেহাদ

শুভজিৎ রায়

আফগানিস্থান, পাকিস্তান গেল। পূর্ববঙ্গ গেল। কাশ্মীর গেল। ভবিষ্যতে কেরল আর পশ্চিমবঙ্গও যাবে। তবুও বঙ্গ মিডিয়া সেকুলারিজম ত্যাগ করতে পারবে না। ভারতীয় বিনোদন মিডিয়ার মতে মুসলমানরা কখনই খারাপ হতেই পারে না। ওরা ছাড়া বাকি সবাই খারাপ, সাম্প্রদায়িক আর জাতিবিদ্বেষী। এই ধারনাকে আরও মজবুত করতে বলিউডে জাঁকিয়ে বসেছে ইসলাম। অমিতাভ, ধর্মেন্দ্র, জিতেন্দ্রদের সময়ে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের বা মা-বাবার চরিত্রগুলোকে দেখা যেতো নিজেদের প্রেম সফল করার জন্য অথবা নিজেদের পুত্র-কন্যাদের শোধরানোর জন্য শিবমন্দির বা কৃষ্ণমন্দির সহ বিভিন্ন মন্দিরে হত্যে দিয়ে থানা গেড়ে বসে থাকতে, ক্রমাগত মন্দিরের ঘণ্টা বাজাতে। কিন্তু এখন বলিউডে কেবলই দেখা যায় মসজিদের সামনে মোল্লা টুপি পড়ে বসে থাকা নায়ক-নায়িকাদের, শোনা যায় আজানের ধ্বনি। লাভ জিহাদকে প্রশ্রয় দিতে নির্মাণ হয় কেদারনাথের মতো একাধিক মশলাদার প্রেম কাহিনীর ছায়াছবি। এরই নাম ‘সাংস্কৃতিক জেহাদ’। বিনোদন-এর মাধ্যমে ইসলামকে জনপ্রিয় করা।

এই সেকুগিরির দৌড়ে পিছিয়ে নেই বঙ্গের চলচ্চিত্র জগতও। হিন্দু মেয়ে শুভশ্রী মুসলিম যুবককের বেশধারী নায়ক দেবকে ভালোবেসে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এরপর ভিলেন বাবার পোষা গুণ্ডাদের সৃষ্ট হাজারো বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে কোন মসজিদে বসে কাজি বা মৌলবির নজরদারিতে শুভ-পরিনয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অথবা রণজিৎ মল্লিক মুসলমান রেহেমত মল্লিক সেজে হিন্দু নায়ক-নায়িকাদের গুণ্ডা বাহিনীর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে সাম্প্রদায়িক আর ধর্মান্ধ হিন্দু বাঙালিদের সেকুলারিজমের পাঠ পড়াচ্ছে, টলিউডের বহুদিন ধরেই এ খুবই কমন দৃশ্য। এই সেকুলারিজমের পালে হাওয়া যোগাতে সম্প্রতি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলো ‘গোত্র’ নামের এক ছায়াছবি।

গোত্র মুক্তি পায় আগস্ট, ২০১৯-এ

‘গোত্র’-র মূল বিষয়বস্তু হলো মুসলমানদের বিশ্বাসযোগ্যতা বটবৃক্ষের মত মহিরুহের চেয়েও দৃঢ়। ‘গোত্র’-র কাহিনী অনুসারে গোবিন্দ ধাম নামে এক বহু পুরাতন জমিদার বাড়িতে একাকি বসবাস করেন মুক্তি দেবী নামে এক হিন্দু বৃদ্ধা। তিনি একজন একনিষ্ঠ বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। মুক্তি দেবীর একমাত্র ছেলে অনির্বাণ কর্মসূত্রে বহুদূরে বিদেশে বসবাস করেন। একা থাকার ফলে দৈনন্দিন নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হয়ে বাড়িতে একজন বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার নিয়োগের কথা চিন্তা করলেন মুক্তি দেবী। অপরদিকে তারেক আলি হলেন একজন প্রাক্তন আসামি। সদ্য জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে তারেক। নিজের পূর্বের কৃতকর্মের জন্য তীব্র অনুশোচনায় ভোগা তারেক কোন ভাল কাজ করে পুণ্য অর্জন করে নিজের নতুন জীবন শুরু করতে আগ্রহী। অতএব তারেক যোগ দিল গোবিন্দ ধামের কেয়ারটেকারের পদে। এরপর ধাপে ধাপে নিজের বিশ্বস্ততার প্রমান দিলো তারেক। তারেকের ধর্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত মুক্তি দেবীর সাথে তারেকের মাতা আর পুত্রের মতো মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠল!

লেখার শেষে একমাত্র প্রশ্ন, মুসলিমরা যদি এতোই বিশ্বস্ত হবে তাহলে ১৯৪৬-৪৭ সাল, ১৯৭০-৭১ সালে এবং খালেদা জিয়ার শাসনকালে কেন কাতারে কাতারে হিন্দু বাঙালিদের পূর্ববঙ্গে অবস্থিত নিজেদের ‘গোবিন্দ ধাম’ ত্যাগ করতে হয়েছিল? কেন ওই পারের বাঙালি হিন্দুরা রাতারাতি একবস্ত্রে প্রান হাতে করে পালিয়ে এসে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল অসম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, আন্দামান সহ ভারতের একাধিক রাজ্যে? কেন এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় রোহিঙ্গা সহ একাধিক মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের করা দাঙ্গার মুখে পড়তে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের? কেন বারবার একই অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন দানিশ কানেরিয়া সহ পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দুরা আর কাশ্মীরের হিন্দু পন্ডিতেরা? যেসব বাঙালিরা হইহই করে ‘গোত্র’-র মতো বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণোদিত সিনেমাগুলো দেখতে যাচ্ছেন, তারা কি এর উত্তর গুলো ভেবে দেখেছেন? সাংস্কৃতিক জেহাদকে না বলুন; ‘গোত্র’-র মত ছায়াছবিকে বয়কট করুন।

Blog at WordPress.com.

Up ↑

Design a site like this with WordPress.com
Get started