ভবিষ্যতের সংখ্যালঘু হিন্দু

যুগলকৃষ্ণ পাল

পশ্চিম বঙ্গের ১০০ জন হিন্দু নেওয়া হলে তাদের চেহারাটা হবে মোটামোটি নিম্নরূপ:
৫০ টি বুড়ো +
৩০ টি আধবুড়ো +
২০ টি বাচ্চা = মোট ১০০ জন।

পক্ষান্তরে ১০০ জন মুসলিম নেওয়া হলে তাদের সম্ভাব্য চেহারা হবে এরূপ:
২০ টি বুড়ো +
৩০ টি আধবুড়ো +
৫০ টি বাচ্চা = মোট ১০০ জন।

উপরের দু’টি ক্ষেত্রেই মোট সংখ্যায় সমান (১০০) হলেও আসলে ওরা সমান নয়। কারণ, প্রকৃতির নিয়মে দু’পক্ষেরই প্রথমে বুড়োলোকগুলো মারা পরবে। তারপরে আসবে আধবুড়োদের পালা। অর্থাৎ প্রথম পক্ষের যখন ৫০ জন বুড়ো মারা যাবে দ্বিতীয় পক্ষের তখন মাত্র ২০ জন বুড়ো মারা যাবে।

অর্থাৎ দু পক্ষের সংখাটা আর সমান থাকবেনা। দু’পক্ষের সংখ্যাগুলো দাড়াবে নিম্নরূপ:
১ম পক্ষের লোকসংখ্যা হবে (১০০-৫০) জন বা ৫০ জন।
যেখানে দ্বিতীয় পক্ষের লোকসংখ্যা হবে (১০০-২০) বা ৮০ জন।

অতএব সময়ের সাথে সাথে দেখা যাবে দু’পক্ষের লোকসংখ্যা সমান থাকবে না। এটাই জনবিন্যাস পরিবর্তনের চরিত্র বৈশিষ্ট্য। আর এই পরিবর্তনটা ঘটে জ্যামিতিক অনুপাতে, গোদা বাংলায় বললে লাফিয়ে লাফিয়ে পরিবর্তন ঘটে।

পশ্চিম বঙ্গের বর্তমান হিন্দু : মুসলিম অনুপাতটি ৭:৩ ধরা হলে এবং এই অবস্থায় মুসলিম জন্মহার কমিয়ে এনে যদি হিন্দুর সমানও করা হয়, তাতেও পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুর সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবেনা। তার একমাত্র কারণ মৃত্যুর হার সমান হবেনা। আশা করছি, নিচের গানিতিক উদাহরণ বিষয়টি পরিষ্কার করবে।

হিন্দু : মুসলিম অনুপাত = ৭(৫০+৩০+২০) : ৩(২০+৩০+৫০)
স্বাভাবিকভাবে দু’দলেরই প্রথমে বৃদ্ধদের মৃত্যু ঘটবে।
১ম পক্ষের (হিন্দুর) মৃত্যুর সংখ্যা = (৭×৫০) বা ৩৫০ জন।
২য় পক্ষের (মুসলিম) মৃত্যুর সংখ্যা = (৩×২০) বা মাত্র ৬০ জন।

সময় আরো এগোতে থাকবে এবং প্রকৃতির নিয়মেই আধবুড়ো লোকগুলো বুড়ো হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরবে। আধবুড়োদের মৃত্যুর সংখ্যাটা হবে নিম্নরূপ:

১ম পক্ষের (হিন্দুর) মৃত্যুর সংখ্যা= (৭×৩০) বা ২১০ জন।
যেখানে দ্বিতীয় পক্ষের (মুসলিম) মৃত্যুর সংখ্যা হবে = (৩×৩০) বা মাত্র ৯০ জন।

এবার দেখাযাক, ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সব বুড়ো ও আধবুড়ো লোকের মৃত্যুর পর (এখানে ধরে নেওয়া হল যে এই সময়ের মধ্যে কোনো পক্ষেই কোনো বাচ্চার জন্ম হয়নি অথবা মোট সমান সংখ্যক বাচ্চা জন্মেছে):

প্রথম (হিন্দু)পক্ষের মোট সংখ্যা = ৭(৫০+৩০+২০) – ৭(৫০+৩০) বা (৭০০-৫৬০) বা মাত্র ১৪০ জন।

দ্বিতীয় (মুসলিম) পক্ষের মোট সংখ্যা = ৩(২০+৩০+৫০) – ৩(২০+৩০) বা (৩০০-১৫০) বা ১৫০ জন।

অর্থাৎ তখন অনুপাতটি হবে নিম্নরূপ :
হিন্দু : মুসলিম = ১৪০ : ১৫০

অতএব দেখা যাচ্ছে হিন্দুর সংখ্যা হবে ১৪০ জন যেখানে একই সময়ে মুসলিম সংখা হবে ১৫০ জন।

তাই, পশ্চিম বঙ্গে হিন্দুর সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া ভবিতব্য হয়ে আছে, যেখানে মুসলিম সংখা হিন্দু সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৯৫১ সালের জনগননায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। তারপরের ৭০ বছর ধরে এলো হিন্দু উদ্বাস্তু। কিন্তু তাতেও রাজ্যে হিন্দুর অংশ বাড়াতো দূরে থাক তা ৮০ শতাংশ থেকে কমতে কমতে ৭০ শতাংশ হয়ে গেছে।
কোন যাদুতে এটা সম্ভব হয়েছে যে টানা সাত দশক ধরে পূর্ব পাকিস্তান / বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হিন্দুরা এসে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর সাথে যুক্ত হয়েছে, তা সত্যেও পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যায় হিন্দুর অংশ /শতাংশ বাড়লো না, উল্টে কমে গেল? এ কোন ম্যাজিক?

(লেখকের মতামত একান্ত নিজস্ব)

হালাল খাবার এবং উকিল জোগাড়

সৌভিক দত্ত

● জার্মান বেকারি বোমা বিস্ফোরণ মামলা
● লস্কর সংযোগ মামলা
● ISIS ষড়যন্ত্র মামলা কোচি
● ISIS ষড়যন্ত্র মামলা মুম্বাই
● ISIS ষড়যন্ত্র মামলা
● ২৬/১১ মুম্বাই আক্রমণ মামলা
● চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম বোমা বিস্ফোরণ মামলা
● জংলি মহারাজ রোড পুনে বোমা বিস্ফোরণ মামলা
● ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন মামলা
● জাভেরী বাজার সিরিয়াল বিস্ফোরণ
● সিমি ষড়যন্ত্রের মামলা
● জামে মসজিদ বিস্ফোরণ মামলা
● ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন ষড়যন্ত্র মামলা
● আহমেদাবাদ সিরিয়াল বিস্ফোরণ মামলা

যদি জিজ্ঞেস করি উপরের সমস্ত মামলাগুলিতে আসামি পক্ষ কারা ছিলো? সবাই উত্তর দিতে পারবেন কমবেশি! হ্যাঁ আসামীদের নাম নিশ্চয়ই পারবেন না‚ তবে তারা কোন সম্প্রদায়ের‚ কি চায় তারা‚ কেন তাদের নামে এই কেসগুলো হয়েছিল এসব সবাইই অবশ্যই জানেন নিঃসন্দেহে!

কিন্তু ধরুন যদি প্রশ্ন করি এদের মামলায় লড়ার টাকা কাদের পকেট থেকে এদের উকিলের কাছে গেছে? আর যদি উত্তর দি আপনারই পকেট থেকে! আপনার‚ মানে সমস্ত অজেহাদী‚ অকমিউনিস্ট পাঠকের কাছ থেকে! কি চমকে গেলেন তো?

হ্যাঁ তাহলে বরং খোলসা করি পুরো বিষয়টা।

আচ্ছা আপনারা জামিয়াত উলেমা-ই- হিন্দ এর নাম শুনেছেন? সেই যে সুপ্রিম কোর্টের রাম মন্দির রায়ের বিরুদ্ধে সবার প্রথমে কেস করেছিল এই জামিয়াত উলেমা-ই-হিন্দ! মনে আছে? আবার উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত হিন্দুত্ববাদী নেতা কমলেশ তিওয়ারী খুন হয়ে গেলে তার আসামীদের হয়েও কেস লড়ছে এই জামিয়াত উলেমা-ই-হিন্দ।

হ্যাঁ! কিঞ্চিৎ পরিচয় তো হলো! এবার বলুন তো হালাল কি? মাংস? শুধু মাংস? উহুঁ ‚ একদমই না। এইজন্যেই বলা হয় হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে না জানলেও ক্ষতি নেই‚ ধার্মিক হওয়া এমনিতেও মোটেও সুবিধার কিছু না। তবে ইসলাম সম্পর্কে অবশ্যই জানুন। এটা প্রয়োজন! সোজা ভাষায় বলতে গেলে হালাল হল ইসলামে নিষিদ্ধ নয়‚ এমন জিনিস। যার মধ্যে যেকোনো জিনিসই ঢুকে যেতে পারে! যেকোনো জিনিস।

আর ভারতে কোনো ব্যবসা হালাল কিনা তার সার্টিফিকেট দেয় এই জামিয়াত উলেমা-ই- হিন্দ! যদিও আরও অনেক ইসলামী সংস্থাই দেয়‚ তবুও সবথেকে প্রাচীন আর সুপরিচিত সংস্থা রূপে এর ছাড়পত্রের গুরুত্ব সারা পৃথিবীতে আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত সংস্থা ব্যবসা করার আগে এদের থেকেই ছাড়পত্র নেয় যে তাদের প্রোডাক্ট হারাম নয়‚ হালাল! অর্থাৎ কিনা এই সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই কোনো মুসলিম ক্রেতা আপনার থেকে জিনিস কিনবেন‚ তার আগে নয়।

চিপ্স এর প্যাকেটে হালাল লোগো

ব্যাপারটা বুঝলেন কি না? ধরুন আপনি একটা চিপ্সের কোম্পানি খুলবেন বা কোনো রেস্তোঁরা, হোটেল, হাসপাতাল, প্রসেসড ফুড ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট, কসাইখানা, দুগ্ধজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পুষ্টিকর পরিপূরক, ওষুধ এবং অন্যান্য যেকোনো দ্রব্য। তা এখন আপনার এই চিপ্স মুসলিমদের খাওয়া উচিত কিনা তা মুসলিমরা কি ভাবে বুঝবে? বুঝবে তখনই যখন এই সার্টিফিকেট দেওয়ার সংস্থা গুলো আপনাকে সার্টিফিকেট দেবে যে আপনার চিপ্স হালাল‚ অর্থাৎ মুসলিম দের খাওয়ার যোগ্য। উপরের ছবিতে চিপ্স এর প্যাকেটে হালাল লোগো লক্ষ্য করুন।

যেমন উদাহরণ দেওয়া যায়, বাবা রামদেবেকেও কিন্তু তার কোম্পানি পতঞ্জলির পণ্য ইসলামিক দেশগুলিতে রফতানি করার সময় জামিয়াত উলেমা-ই- হিন্দ এর থেকেই থেকে হালাল সার্টিফিকেট নিতে হয়েছিল। যাতে সেই ইসলামী দেশগুলোর মুসলিম ক্রেতারা পতঞ্জলির পণ্য কেনে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ম্যাকডোনাল্ডস কিন্তু হালাল ছাড়া অন্য কিছু পরিবেশন করে না। জোম্যাটোও তাদের তালিকাভূক্ত রেস্তোরাঁ বা খাবারের আউটলেটগুলো হালাল পরিবেশন করে কিনা স্পষ্ট করে চিহ্নিত করে দেয়। হ্যাঁ সেই জোম্যাটো যারা খাদ্যের ধর্ম হয়না বলে জ্ঞান দিয়েছিলো!

জামিয়াত উলেমা-ই- হিন্দের হালাল সার্টিফিকেশনের ফি চার্ট

কোনো নতুন আউটলেটকে হালাল সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য জামিয়াত উলেমা-ই- হিন্দ 20,000 টাকা পর্যন্ত চার্জ নেয় (সাথে জিএসটি চার্জ অতিরিক্ত)। আরো মজাদার হলো এই সার্টিফিকেট কেবল মাত্র এক বছরের জন্য বৈধ থাকে এবং তারপর এটি পুনর্নবীকরণ করতে হয় যার জন্য তাদের অতিরিক্ত ফি হিসাবে 15,000 টাকা খরচ করতে হয়।
প্রতিটি পণ্য আলাদা ভাবে হালাল-প্রত্যয়িত হওয়া প্রয়োজন, যার মূল্য 500 টাকা (উপরের দেখুন)।

এখন যেহেতু, ভারতে অমুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ! ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ ব্যবসা অমুসলিমদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং গ্রাহকরাও বেশিরভাগই অমুসলিম (অঙ্কের হিসাব যা বলে আরকি) তাই সার্টিফিকেটের জন্য জেউএইচ-এর মতো ইসলামিক সংস্থাগুলিতে যে অর্থ যায় তার সিংহভাগই কিন্তু যায় আমার আপনার মতো অমুসলিমদের কাছ থেকে!

মানে জাস্ট ভাবুন। আপনি বিশ্বমানব‚ উদারপন্থী‚ সেকুলার‚ বিজ্ঞানপন্থী‚ যুক্তিবাদী (এবং এই জাতীয় স্বলেহনের ঢেকুর তোলা শব্দ যা যা আছে আরকি)! ফলে খাবার নিয়ে আপনার কোনো মাথাব্যথা নেই। ভালো কথা। কিন্তু মুসলিম দের তো আছে।

আর কোম্পানি গুলো এটা ভালো করেই জানে। ফলে ওরা আপনাদেরই পকেট থেকে পাওয়া টাকা খরচ করে হালাল সার্টিফিকেট আনে জামিয়াতের কাছ থেকে যাতে মুসলিম উপভোক্তারা তাদের কাছে আসে। আর জামিয়াত সেই টাকা কোথায় ব্যবহার করছে? না ‚ সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে অভিযুক্তদের কেস লড়ার জন্য। আর সন্ত্রাসবাদও ছাড়ুন। ভারতের সমস্ত অমুসলিম দের টাকা ব্যবহৃত হচ্ছে শুধুমাত্র মুসলিমদের কেস লড়ার জন্য। কি অদ্ভূত না? আর আমরাও চুপচাপ এটা মেনে নিচ্ছি।

ড্রেন অফ ওয়েলথ বোঝেন? ড্রেন অফ ওয়েলথ। সম্পদের নির্গমন বলে যাকে সাদা বাংলায়।

এবার আপনারাই ভাবেন আপনারা কি করবেন। কোন কোম্পানির প্রোডাক্ট কিনবেন। কোন রেস্তোরাঁ তে খেতে যাবেন। আর কেনই বা যাবেন।

তথ্যসূত্র: অরিহন্ত পাওয়ারিয়া

বাঙালি হিন্দুর বিশ্বমানবতার ঘাটে বিসর্জনের বাজনা

উত্তম দেব

বাঙালি হিন্দুর বিশ্বমানবতা, ঔদার্য এবং বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষতা নিয়ে যেমন সংশয় নেই তেমনি বাঙালি হিন্দুর স্বজাতি বিমুখতা নিয়েও কোন‌ও সন্দেহ নেই। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বর্ণহিন্দুরা ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া জগতে আর কিছু বোঝে না। এরা উপরে উঠলে, দুটো পয়সার মুখ দেখলে জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো এমনকী মায়ের পেটের ভাইবোনদের‌ও চেনে না। গোষ্ঠীপ্রীতি তো দূরের কথা।

বাঙালি বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্যকে খারাপ চোখে দেখে এসেছে। দুই পাতা ইংরেজি বিদ্যা শিখে সরকারি চাকরি লাভকে মোক্ষ ভেবেছে এতকাল। বাঙালির ঘাড়ে সবার আগে ইংরেজ চেপেছিল। তাই ইংরেজ স‌ওদাগরের আপিসে চাকরি করে মাসান্তে দুটো টাকা নিশ্চিত মাইনে তার সঙ্গে ভাগ্য ভালো থাকলে আর‌ও দুটো পয়সা উপরি কামাই – এই স্বল্প অথচ সহজ প্রাপ্তির লোভ থেকেই বাঙালি হিন্দুর চাকরি প্রীতি। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের আগে পর্যন্ত এই প্রীতি কাটানো তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। বাঙালি বর্ণহিন্দু সবার আগে রাতের অন্ধকারে পূর্ববঙ্গে নিজের ভিটে ছেড়েছে চোরের মতো। এমনকী নিজের প্রতিবেশী ও আত্মীয়কে পর্যন্ত না জানিয়ে।

শেষ পর্যন্ত লড়েছিল নিম্নবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা। যদিও শেষতক তারাও সংখ্যাগুরু দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই পায় নি। তবুও তারা মাটি কামড়ে আপন জমি রক্ষা করেছিল বলেই এখনও বাংলাদেশে ৮-৯ শতাংশ হিন্দু টিকে আছে। আমি নিজে জন্মসূত্রে বর্ণহিন্দু। বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মতুয়াদের মধ্যে‌ই দেখছি কেবল সংঘশক্তি আছে। এবং আজকে তারা এর রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড‌ও পাচ্ছে। সংঘশক্তি ব্যতীত কোন‌ও জনগোষ্ঠীর কপালে রাষ্ট্রের খাতির জোটে না।

নিজের জাতিগোষ্ঠীকে দেউলিয়া এবং দুর্বল বানিয়ে বিশ্বমানবতার নামে খঞ্জনি বাজানোর আরেক নাম বিনাশ। বাঙালি হিন্দুর ভেতরে এই বিনাশবুদ্ধি বড় মারাত্মক। বলতে দ্বিধা নেই একটা দীর্ঘ সময় বামপন্থীরা বাঙালি হিন্দুর এই বিনাশবুদ্ধির গোড়ায় ধূপধুনো দিয়েছে। উদারবাদ ততক্ষণই উত্তম যতক্ষণ আমার জন্য উত্তম। কিন্তু যখন উদারবাদ আপন সর্বনাশের কারণ তখন তার মতো অধম জিনিস আর নেই। এটা পৃথিবীর সব জাতি বোঝে একমাত্র ব্যতিক্রম বিশ্বমানবিক বাঙালি। পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুর দুর্দশা দেখে পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বমানবতাবাদী, উদার প্রগতিশীলরা কখনও দু’ফোঁটা চোখের জল খরচ করেননি পাছে তাদের বিশ্বমানবতার পবিত্র আলখাল্লাটিতে সঙ্কীর্ণতার কাদা লাগে এই ভয়ে। অথচ গত তিরিশ বছরে বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের উদারবাদী বাঙালিও দু’ছটাক উৎকণ্ঠা প্রকাশের অনেক সুযোগ পেয়েছিল।

তবে সময় বড় নির্মম এবং বেশ খেয়ালিও বটে। এখন দুনিয়া জুড়ে বিশ্বপ্রেমের বদলে গোষ্ঠীপ্রেমের জোয়ার উঠেছে। এই জোয়ারে ভুবনবাদী বাঙালি হিন্দুও ইদানিং বিশ্বভুবনের হিত ভুলে বেসুরো গাইছে। পশ্চিমবঙ্গে বসে যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের অন্ধ বিরোধিতা করছেন তারা দেওয়ালের লিখন পড়তে পারছেন না। তবে শীঘ্রই পড়তে পারবেন। এই আইনের ভেতর মোদী-শাহের সূক্ষ্ম রাজনীতি নেই এটা বলার মতো মূর্খ আমি ন‌ই। কিন্তু এই আইন যে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের প্রতি ভারত সরকারের একটি স্বীকৃতি এটা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। ১৯৪৭-এর পর এই উপমহাদেশে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের মতো হতভাগা এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠী আর দ্বিতীয়টি নেই। বাঙালি হিন্দুর মনের নাউ সহসা আর বিশ্বমানবতার ঘাটে ভিড়ছে না।

(লেখকের মতামত একান্ত নিজস্ব)

ধর্মনিরপেক্ষতা: মিথ্যাচার ও ভন্ডামি

দেবতনু ভট্টাচার্য

একবার মিথ্যার জাল বোনা শুরু করলে সেই জালে নিজেই জড়িয়ে পড়তে হয়। ভারতের রাজনীতিতে ‘সেকুলারিজম’ হলো সবথেকে বড় একটা মিথ্যা। হিন্দু বহুল ভারতে সেকুলারিজমের শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে অপ্রয়োজনীয়। যারা সেকুলারিজমের ধ্বজাধারী, তারাও এটা জানে। আসলে এই শব্দটার আড়ালে সীমাহীন মুসলিম তোষণটাই এদের মূল লক্ষ্য। ১৯২০ সালের খিলাফত আন্দোলনের সময় মোহনদাস গান্ধীর হাত ধরে যে মুসলিম তোষণের যাত্রা শুরু হয়েছিলো, চিত্তরঞ্জন দাসের বেঙ্গল প‍্যাক্টের মধ্য দিয়ে এই বাংলায় সেই মিথ্যাচারের পরম্পরা নিজের গতিপথ ধরে আজও এগিয়ে চলেছে। বাঙালি আর সেই ভণ্ডামি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে নি। সেই জালে জড়িয়ে পড়েই বাঙালি তার সর্বস্ব খুইয়েছে।

১৯০৫ থেকে ১৯১১, বৃটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য যখন মধ্যগগনে, আমরা বঙ্গভঙ্গ রোধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ১৯৪৭ এ বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয় হলেও শক্তিক্ষয়ের ফলে যখন বৃটিশদের কোমর ভেঙে গেছে, তখন আমরা দেশভাগ মেনে নিলাম! এর মূল কারণ তোষণনীতিতে বিশ্বাসী কংগ্রেসের নেতৃত্ব তখন মুসলমানদের সামনে নতজানু এবং তাদের প্রচারিত ‘এক‌ই বৃন্তে দু’টি কুসুম’- এর জড়িবুটি খেয়ে হিন্দু সমাজ তখন হিন্দু-মুসলিম ভাইচারার খোয়াব দেখছে। তারা বিশ্বাস করতো যে গান্ধী-নেহেরু থাকতে দেশভাগ হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে প্রান্তিক লাঙ্গলধরা হিন্দু কিংবা আঁশবঁটি হাতে হিন্দু- কেউই মন থেকে এই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস না করলেও গান্ধী-নেহেরুর তোষণবাদী কংগ্রেস‌ই ছিলো সার্বিকভাবে হিন্দু সমাজের আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণ হিন্দুরা ভারতের স্বাধীনতা লাভের লড়াইয়ের দৌড়ের ব্যাটন কংগ্রেসের হাতে তুলে দিয়েই নিশ্চিন্ত ছিলো। সেই কংগ্রেস হিন্দুদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানের দাবি মেনে নিলো। বাংলা ভাগ হলো, বাঙালির জীবনে নেমে এলো বিপর্যয়। শ্যামাপ্রসাদ লড়েছিলেন বাঙালির জন্য। পাকিস্তানের বুক চিরে বাঙালি হিন্দুদের হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গের রূপকার শ্যামাপ্রসাদের হাতে স্বাধীনতার পর এই এক তৃতীয়াংশ বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পরিবর্তে বিশ্বাসঘাতক কংগ্রেসের হাতেই ক্ষমতা তুলে দিলো এই বাঙালি!!

দেশভাগের সময় যে কমিউনিস্ট পার্টির স্লোগান ছিল – পাকিস্তানের দাবি মানতে হবে, তবেই ভারত স্বাধীন হবে, সেই কমিউনিস্ট পার্টি ওই বাংলায় (পড়ুন তাদের আকাঙ্খিত পাকিস্তানে) অবলুপ্ত হয়েছে কিন্তু এই বাংলায় ৩৪ বছর শাসন ক্ষমতায় আসীন থেকেছে। ওপার বাংলা থেকে পাকিস্তানের সমর্থক এই রিফিউজি কমিউনিস্টরা মুসলমানের লাথি খেয়ে এখানে এসে নেতামন্ত্রী হয়েছে আর ওপার থেকে মুসলমানের লাথি খেয়ে এপারে আসা রিফিউজি বাঙালি সমাজ এই পাকিস্তানের দালালদের দুহাত ভরে ভোট দিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির সরকার এই রিফিউজিদের ভোটার কার্ড দিয়েছে, রেশন কার্ড দিয়েছে কিন্তু এদের নাগরিকত্বের জন্য আন্দোলন সংগঠিত করে নি। এরা সেইভাবে চায়‌ও নি তাদের এই প্রাপ্য মর্যাদা। দীর্ঘ ৩৪ বছরে শাসন ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করে সিস্টেমেটিক ব্রেনওয়াশের মাধ্যমে বাঙালি উদ্বাস্তুদের মন থেকে একটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্নকে একেবারে মুছে ফেলেছে। সেই প্রশ্নটা হল – আমরা কেন উদ্বাস্তু হলাম!!

২০১১-র পরের ঘটনাবলী না হয় নাই বা বললাম। ইমাম ভাতা দেওয়া, ওবিসি (এ) ক‍্যাটাগরিতে প্রায় ১০০% মুসলমানকে সংরক্ষণের আওতায় আনা, দুধেল গাইয়ের লাথ খেতে থাকা যে আমাদের জাতীয় কর্তব্য – সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার এখন সেকুলারিজমের মূর্ত প্রতীক। বাঙালির ভোটেই কিন্তু এই সরকার তার দ্বিতীয় ইনিংস খেলছে। সম্প্রতি রাজ্যের উপনির্বাচনে বাঙালি এই সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়েছে।

নাগরিকত্ব আইন এনেছে মোদি সরকার। এর ফলে তাদের বহু আকাঙ্খিত নাগরিকত্ব পাবে কয়েক লক্ষ অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, অপমানিত বাঙালি। অথচ এই নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তাণ্ডব শুরু হয়েছে এই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেই। পশ্চিমবঙ্গের সরকার ঘোষণা করেছে এরাজ্যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন লাগু হবেনা। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় এই আইনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে কয়েকজন বাঙালি। তারা জনপ্রতিনিধি। তারা কি চায় না বাঙালি উদ্বাস্তুরা নাগরিকত্ব পাক? ঠিক তা নয়, তাদের দাবি মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের‌ও নাগরিকত্ব দেওয়া হোক। তা না হলে হিন্দু উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেওয়া এই আইন বাতিল। ঠিক যেন ‘৪৬ এর কমিউনিস্ট পার্টির সেদিনের স্লোগান- ‘পাকিস্তানের দাবি মানতে হবে, তবেই ভারত স্বাধীন হবে’ আজ নতুন রূপে- ‘অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের নাগরিকত্ব দিতে হবে, তবেই বাঙালি উদ্বাস্তুরা নাগরিকত্ব পাবে’! চোখে সেকুলারিজমের চশমা। তাই এদের দৃষ্টিতে পাকিস্তানের দাবিদার বাংলার কসাই সুরাবর্দী কিংবা গোলাম সারোয়ারদের উত্তরসূরী অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী মুসলমান আর ভারতের স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানকারী মাস্টারদা সূর্যসেন, বিনয়-বাদল-দীনেশ কিংবা বাঘাযতীনের উত্তরসূরী হিন্দু উদ্বাস্তুরা সমান! এ তো ধর্মনিরপেক্ষতা নয়! এ হল বাঙালির সর্বনাশের বীজমন্ত্র!!

এত কথার অবতারণা কেন? কারণ একটা প্রশ্ন আজ খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। প্রশ্নটা হল, আমরা বাঙালিরা জেনে বা না জেনে সেকুলারিজম নামক যে মিথ্যার জালে জড়িয়ে পড়েছি, তাকে ছিন্ন করে আমরা কি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো? আমরা কি চিরকাল ভণ্ড‌ই থাকবো? আমরা কি আজও ‘ব্রেকিং ইন্ডিয়া ফোর্স’ এর হাতেই নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্যকে সমর্পিত করে দু’টাকা চালের পিছনে কিংবা একটা ইন্দিরা আবাসের পিছনে ছুটতে থাকবো? এই প্রশ্নের জবাব আমাকে নয়, মোদি-শাহ’কেও নয়, নিজের বিবেককে দিতে হবে।

উপেক্ষিত মহাপ্রাণ: যীশু খৃষ্টের অজানা জীবন

সুপ্রিয় ব্যানার্জ্জী

ভারতে তখন চলছে কুষাণ যুগ। কাশ্মীরের জোজিলা গিরিপথের কাছে হেমিস বৌদ্ধ মঠে দেহত্যাগ করলেন পশ্চিম দেশীয় সাধক ঈশা। শ্রীনগরের কাছে ‘রোজাবাল’, সেখানে তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। কাশ্মীরে সাধুসন্তদের সমাধিকে রোজাবাল বলা হয়। কাশ্মীরের অধিবাসীরা একজন প্রাচীন হিব্রুভাষী ইহুদি পুণ্যবান পুরুষের কথা বলে আসছে। তাঁর নাম উজ আসাফ (Yuz Asaf) অর্থাৎ ‘Leader of Healed’। এই উজ আসাফই হলেন ঈশা। ঈশাই হলেন যীশু খৃষ্ট। কাশ্মীরে মুসলিম আগমনের পূর্বে বৌদ্ধ ও হিন্দুরা রোজাবাল দেখাশোনা করত। পরে পঞ্চদশ শতকে মুসলিম এক পীরকে রোজাবাল এ সমাহিত করা হয়। সেই পীরের নাম সৈয়দ নাসর-উদ-দিনিস ।

যীশুর জীবনের ১৩ থেকে ৩০ বছরের কথা বাইবেলে উল্লেখ নেই। খৃষ্টান দুনিয়া সযত্নে এড়িয়ে চলে ঐ নিয়ে চর্চা। কারণ হিসাবে মনে করা হয় যে, যীশুর উপর খৃষ্টান দুনিয়া তথা ভ্যাটিকানের একাধিপত্য থাকবে না সব প্রকাশ পেলে।

গবেষকদের মতে যীশুর শান্তি, অহিংসা ও প্রেমের বাণী হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রভাবে প্লাবিত। মিশরের আলেকজেন্দ্রিয়া বৌদ্ধধর্ম চর্চার বড় কেন্দ্র ছিল। সেখানেই প্রথম বৌদ্ধ দর্শনের পাঠ নেন যীশু, পরবর্তীতে ভারতে।

দুই বার ভারতে এসেছিলেন যীশু।
◆ প্রথম বার মিশর থেকে ভারতে এসেছিলেন বৈদিক, বৌদ্ধ ও আয়ুর্বেদ শিক্ষার জন্য। তক্ষশীলা সহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা লাভ ক‍রেন।
◆ দ্বিতীয় বার এসেছিলেন ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর। বাইবেল অনুযায়ী যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল শুক্রবার দুপুরে। তিন ঘন্টা পর অচেতন যীশুর দেহ ক্রশ থেকে নামিয়ে নিকটস্থ সমাধি গুহায় রাখা হয়। ক্রশবিদ্ধ হওয়ার পর ৬ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভব। যীশুও বেঁচে ছিলেন। সমাধি গুহা থেকে পালিয়ে জেরুজালেমের বাইরে কোথাও লুকিয়ে ছিলেন যীশু ও মেরি। তারপর ক্ষত সেরে উঠার পর নাম বদলে ফেলে ছদ্মবেশ ধারণ করে কাফেলার সঙ্গে রেশম পথ ধরে পূর্ব পরিচিত ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পন্ডিতদের ধারণা প্রথম শতকের মাঝামাঝি কাশ্মীরে পৌঁছান যীশু। মেরি কাশ্মীরেই মারা যান। পাকিস্তানের মারি শহরে মেরির সমাধি ছিল।

কিছু প্রমাণ :-
● নিকোলাস নটোভিচ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে ভারতের কাশ্মীর আসেন এবং লাদাখের হেমিস মঠে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নটোভিচকে প্রাচীন তিব্বতিয় পান্ডুলিপির কথা বলেন, যাতে ইসা নামে এক পশ্চিমদেশীয় জ্যোর্তিময় পুরুষের কথা রয়েছে। নটোভিচ তিব্বতী পান্ডুলিপি অনুবাদ করেন এবং রাশিয়া ফিরে যান। যীশুর অজানা জীবনের কথা প্রকাশ হতে যাচ্ছে শুনে রুশ খ্রিষ্টান কট্টরপন্থিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে। অবশেষে ১৮৯৪ সালে বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে The Unknown life of Jesus Christ বইটি প্রকাশিত হয়। বইটিতে নটোভিচ দাবি করেন যে হারানো বছর গুলোয় যীশু ভারতবর্ষে এসেছিলেন ও এই সময়ে তিনি বৈদিক দর্শন, বৌদ্ধ ধর্ম এবং আয়ুর্বেদ সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করেন।

● যীশুর রহস্য সন্ধানে লাদাখ যান স্বামী বিবেকানন্দের গুরুভাই পন্ডিতপ্রবর স্বামী অভেদানন্দ। হেমিস মঠে যীশু বিষয়ক তিব্বতি পান্ডুলিপি সচক্ষে দেখে বিস্মিত হন তিনি এবং তাঁর বই ‘কাশ্মীর ও তিব্বতী’ গ্রন্থে যীশু বিষয়ক তথ্যাদি সর্বমোট ২২৪ পঙতি বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন।

● হেমিস মঠে তিব্বতীয় পান্ডুলিপিটি অনেকেই দেখেছেন। তাদের মধ্যে হেনরিয়েটা মেররিক অন্যতম। ইনি In the World’s Attic নামে বইয়ের লেখিকা। ১৯২১ সালে মেররিক পান্ডুলিপিটি দেখেন। মেররিক তাঁর লিখেছেন,”In Leh (লাদাখ -এর রাজধানী) is the legend of Jesus who is called Issa, and the Monastery at Himis holds precious documents fifteen hundred years old which tell of the days that he passed in Leh where he was joyously received and where he preached.” (লাদাখের রাজধানী লেহ্তে কিংবদন্তীর যীশু ইসা নামে পরিচিত। এবং হেমিস মঠে রক্ষিত পনেরশ’ বছরের পুরনো মূল্যবান নথিপত্রে যীশুর কথা কথা রয়েছে, যীশুর শিক্ষার কথা রয়েছে। )

● ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে মীর ইজ্জুৎউল্লাহ নামে একজন পারস্যবাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নির্দেশে মধ্য এশিয়া ও লাদাখ সফর করেন। Travels in Central Asia বইতে তিনি লিখেছেন: “They keep sculptured representations of departed saints, prophets and lamas in their temples for contemplation. Some of these figures are said to represent a certain prophet who is living in the heavens, which would appear to point to Jesus Christ.”(তাহারা ধ্যানের নিমিত্ত তাহাদের প্রার্থনাগৃহে পরলোকগত সাধুসন্তের ভাস্কর্য সংরক্ষণ করে। এইসব ভাস্কর্যের কয়েকটি স্বর্গবাসী নবীর-যাহাকে যীশু খৃষ্ট বলিয়া প্রতীয়মান হয়।)

● কাশ্মীরের ইতিহাসের অন্যতম উৎস হল ‘রাজতরঙ্গিনী’। এটি রচিত হয় ১১৪৮ খ্রিস্টাব্দে। রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থটিতে রয়েছে, “ইসানা নামক একজন মহৎ সন্ত ডাল হ্রদের তীরে ইসাবারে বসবাস করিতেন। তাঁহার অসংখ্য ভক্ত ছিল।”

● “বৈশ্যমহাপুরাণ” হিন্দুদের আঠারোটি পবিত্র গ্রন্থের অন্যতম। বৈশ্যমহাপুরাণে প্রথম শতকের কাশ্মীরের রাজার সঙ্গে যীশুর সাক্ষাতের দৃশ্য বর্ণিত আছে। বৈশ্যমহাপুরাণে যীশুকে ‘ইসাপুত্তম’ এবং ‘কুমারীগর্ভস্বংবরণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রীনগরের কাছে রাজা শালিবাহনের সঙ্গে ইসা মহি-র সাক্ষাতের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। রাজা শালিবাহন-এর সময়কাল ৩৯ থেকে ৫০ সাল। শালিবাহন কুষাণ সাম্রাজ্যের কাশ্মীর অঞ্চলের শাসক ছিলেন।

সত্য প্রকাশ পাবেই। আজ না হোক কয়েক শত বছর পরে। জ্ঞানবৃদ্ধ মহাপ্রাণ সাধু যীশুকে ক্ষুদ্র স্বার্থে ধর্মের গন্ডীতে আবধ্য রেখে তাঁর অবমূল্যায়ন করা হয়ে আসছে।

NRC ও CAA – অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঙ্গালীর উত্তরণের সুযোগ

অনিমিত্র চক্রবর্তী

গত বেশ কিছুদিন যাবৎ সমগ্র ভারতবর্ষে হিংসাজনিত কান্ডের ঘনঘটা চলছে। অবশ্যই NRC এবং CAA-2019 এর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদীদের বক্তব্য এই দুটি সদ্যপ্রতিষ্ঠিত চিন্তা ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মূল ভাবনার বিপরীতে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ কোন প্রকারের পরিবর্তন বা বিন্যাস যা ভারতবর্ষের প্রধান ধর্মীয় জনজাতি/হিন্দুকে (ভাষা নির্বিশেষে) এক নতুন পরিচিতি দেবে, শক্তিশালী করবে তা কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনস্বীকার্যভাবে, এর মধ্যে দায়ী প্রধানত হিন্দুর প্রাধান্যর প্রতি ঈর্ষা, অন্তর্নিহিত ঘৃণা এবং অবশ্যই হিন্দুর শোচনীয় সামাজিক পরিস্থিতি, স্থবিরতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, যা তান্ডব ও সুশীলতার যৌথ প্রয়োগকে যারপরনাই উৎসাহিত করেছে।

ধর্মের ভিত্তিতে ‘৪৭-এর দেশভাগের পর সৃষ্ট দুটি রাষ্ট্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্র – পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুসলমানদের। ২০১৯ এ এসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে হিন্দুদের, বিশেষত যারা ঐসলামিক সন্ত্রাসবাদ দ্বারা উৎপীড়িত। অসুবিধা কিসের ও কাদের?

অসুবিধা অবশ্যই তাঁদের যাঁরা দেশভাগের পর ভারতবর্ষের দুই পার্শ্বে দুটি ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করে ও সেখানকার সংখ্যালঘু, বিশেষত হিন্দুর, প্রতি যাবতীয় অকথ্য অত্যাচার করেও সন্তুষ্ট নন, হিন্দু-প্রধান ভারতবর্ষ ও তার শ্রী বৃদ্ধি তাদের একান্ত চক্ষুশূল। অবশ্যই স্মরণে রাখা প্রয়োজন, অখণ্ড বঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমান অঞ্চলগুলি ছাড়া যে ক্ষেত্র থেকে পাকিস্তান আন্দোলন ও তা প্রতিষ্ঠার জয়ধ্বনি উঠেছিল, সেই বিশেষ বিশেষ মুসলমান সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলি ভারতবর্ষেই রয়ে গেছে, পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে এই পাপ বিদেয় নেয়নি। এবং অবশ্যই সেখানে সেই ‘৪৭-এর পরাজয়জনিত ব্যথা ও হাহাকার এখনো বিদ্যমান। যদি এটি না বোঝা হয় তাহলে আমার, আপনার মূর্খামিতে কোন ছেদ পড়বে না, মূর্খ হিন্দু এক পরম সম্পদ প্রত্যেক শক্তির কাছে।

আমরা অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্রের হতভাগ্য হিন্দুরা গত কিছুদিন যাবৎ দেশব্যাপী হিংসার প্রকোপে থেকে যা বুঝলাম (অবশ্যই এক অতি পুরাতন সত্য) – রাষ্ট্র এবং তার শাসনপ্রণালী ততক্ষণই কার্যকরী যতক্ষণ ব্যক্তি কায়মনোবাক্যে রাষ্ট্রের সাথে রয়েছে। আমাদের হিন্দুদের সত্যনিষ্ঠা, সর্বদা রাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীলতা সদা পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অপাংক্তেয়রূপে প্রমাণিত বহুদিন ধরেই। কিন্তু আমাদের complacency/সদা সন্তুষ্টি সেটি আমাদের অনুভব করতে দেয়না, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা তাকে দৃঢ়তর করে প্রত্যেকদিন, আমরা ক্রমশ পরিবর্তিত হই একটি জড়পদার্থে।

তাহলে করণীয় কি? প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে সমস্যাটি কোথায় এবং কে আমার পক্ষে, বিপক্ষে। ১৯৪৭ থেকেই ভারতে একটি ধারণা বদ্ধমূল করা হয়েছে – সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ একটি সাময়িক ঘটনা ও তা বহু সময়ে কার্যকারণ ব্যতীত হয়। যদিও মূল বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন – প্রত্যেক সংঘর্ষ স্বার্থ স্থাপনের একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ। একটি আক্রমণ ঘটবে, তার ধারাবাহিকতায় আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে প্রতিকার হেতু পথে নামব। প্রশাসন তখনই আমাকে স্তব্ধ করার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করবে এবং হঠাৎ এক পক্ষের উদয় হবে যাঁরা বলবেন, “আমরা নাস্তিক, ধর্মের বিরুদ্ধে কিন্তু এসব থামানোর জন্যই পথে নেমেছি। ধরো হাতে হাত, আজ থেকে আমরা সবাই ভাই।” ঝামেলা শেষ হওয়ার চমকপ্রদ গতিতে মুগ্ধ আমি জিজ্ঞেস করি না, “আগের দিনগুলোয় যখন একনাগাড়ে আক্রমণ হচ্ছিল আমার বিরুদ্ধে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?” এবং এই ধারাটিই চলে যায় অবলীলাক্রমে। আজ থেকে ৯০ বছর আগে ১৯৩০ সালে প্রকাশিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ঢাকার পৈশাচিক দাঙ্গার ক্ষেত্রে যা সত্য তা ২০১৯ – এও সত্য। Hindus do remain on the receiving end always…. and there has been no single exception to this even yet…

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন – ২০১৯ পাশ করা হয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নির্যাতিত সংখ্যালঘু অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্যরা যাঁরা সম্পূর্ণরূপে নিরুপায় হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁদের স্বার্থে – তাঁদের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য। যা শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই বুঝবেন এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধং দেহি মনোভাবে বিরোধিতায় মগ্ন এবং নেতৃত্বে তথাকথিত বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা।

এঁরা কারা? তাঁরা যাঁরা ব্যক্তি হিন্দু ও হিন্দু সমাজের উপর একমাত্র ধর্মীয় কারণে অকথ্য অত্যাচার হলে থাকেন নিশ্চুপ।

২০০১ সালে বাংলাদেশে হিন্দু জাতির উপরে নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন; তার ডঙ্কা সুদূর ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্কে বাজলেও বাজেনি পার্শ্ববর্তী কলকাতা তথা ভারতে। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার দেউলা গ্রামে তৎকালীন ১৪-বছর বয়স্ক পূর্ণিমা শীলের উপর ৩০ জন ইসলামী সন্ত্রাসীর গণধর্ষণে। পূর্ণিমার মা শ্রীমতী বাসনা রাণী শীল কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “আমার মেয়ে ছোট। তোমরা বাবা এক এক করে যাও।” অবশ্য এই কথা শোনার পর বাসনা দেবীর ওপরে প্রচন্ড অত্যাচার করলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ধর্মের নামে এই অমানুষিক নির্যাতন বাংলাদেশের সীমিত অংশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সৃষ্টি করলেও ভারতবর্ষের বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ছিলেন তাপ উত্তাপহীন। তাঁদের অনেকেই এটিকে ভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় রূপে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন, অবশ্য গাজা স্ট্রিপ, প্যালেস্টাইনের বিষয়গুলি একান্তভাবেই ভারতীয় – তাই তাঁরা ক্ষোভে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। ভারতবর্ষের ক’টি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশের অকথ্য সংখ্যালঘু অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেষ্ট হয়েছে? প্রতিবাদ করছে? সামান্য হাতে গোনা ক’টি। বিশ্বমানবিক বামপন্থী অভিধানে, বার্ষিক সনদে বাংলাদেশের হিন্দু অত্যাচার নিয়ে একটি লাইনও লেখা হয়না।

২০০৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চালচিত্রে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। এবং তার ৯৯.৯% ক্ষেত্রেই হিন্দুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সর্বাধিক। ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠলে বা নিতান্তই অস্তিত্বরক্ষার খাতিরে হিন্দু প্রতিরোধ গড়ে উঠলেই প্রশাসন অত্যধিক মাত্রায় সচেতন হয়ে পড়ে; এই সচেতনতা অবশ্য প্রথমদিকে থাকে একেবারেই অনুপস্থিত। এই সময়ে হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে কোনোদিন কোথাও লেফট লিবারেলদের দেখা গেছে? দেগঙ্গায়? না। নালিয়াখালী – ক্যানিং? না। কালিয়াচক? না। ধুলাগড়? না। বসিরহাট? না। অর্থাৎ সর্বত্র্যই selective secularism -এর দাপট ও প্রাদুর্ভাব। কিন্তু অহিন্দু স্বার্থ যেখানে বিঘ্নিত হতে পারে কিনা কেউ জানে না সেখানে এঁরা সচেষ্ট, প্রবল পরিমাণে উপস্থিত – হিন্দু স্বার্থের বিরুদ্ধে। এবং ভারতবর্ষে/ভারতীয় উপমহাদেশে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের ঊষালগ্ন থেকে এটাই চলে এসেছে – “…an undying legacy hell-bent to usurp the Sanatani heritage once and for all…”

এমতাবস্থায় আপনার করণীয় কি? আপনার নিজস্ব, সন্তান-সন্ততির স্বার্থকে নির্ধারণ করা। ‘নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ২০১৯’ পাশ হয়েছে এবং তা সবচেয়ে বেশী লাভদায়ক হবে বাঙ্গালী হিন্দুদের ক্ষেত্রে যাঁরা প্রাণের দায়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে ভারতবর্ষে শরণার্থী হয়েছিলেন দশকের পর দশক ধরে। জাতীয় পঞ্জীকরণ বাংলাদেশের মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে বিতাড়ন করতে সচেষ্ট হবে। অসমের অভিজ্ঞতায় বলা যায় এই ক্ষেত্রে কোনরূপেই কোন ধরণের সমঝোতা মেনে নেওয়া হবেনা, আসার কথা কেন্দ্রীয় সরকারও মানতে প্রস্তুত নন। এই কটি কথা বুঝতে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়। গত প্রায় ৭০ বছর ধরে যে পঙ্কিল আবর্তে রয়েছে বাঙ্গালী হিন্দু তা থেকে উত্তরণের জন্য যে কোন পন্থাকেই মেনে নিতে হবে। ইতিহাসে এসকল দৃষ্টান্ত অসংখ্য রয়েছে – যেকোন শক্তিশালী জাতি প্রারম্ভে এরকম অবস্থার মধ্য দিয়েই যায় ও প্রত্যেকটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়।

অতএব, ভাবতে হবে, তার অনুশীলনও করতে হবে। নতুবা আজ থেকে ১০-১৫ বছর পরে আপন গৃহ থেকে উৎখাত হয়ে আপনাকেই ভাবতে হবে কোন লঙ্গরখানাটি সবচেয়ে নিকটে। সাথে থাকবে পঙ্গু অথবা নিহত পুত্র, ধর্ষিতা পুত্রবধূ ও কন্যা, নিহত স্ত্রীর দেহ। ভোট আপনার একটি গণতান্ত্রিক হাতিয়ার মাত্র। কিন্তু অস্ত্র/হাতিয়ার প্রয়োগ হয় মস্তিষ্কের চর্চার মাধ্যমে। নিজ ধর্ম, জাতির শত্রু বা মিত্রকে শনাক্ত করার গুরুদায়িত্ব আপনার, আমার ওপরেই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই হয় – ধ্বংসাত্মক রূপে।

CAA ও খিদে

অর্ণব কোলে

ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার পর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ভারত গঠিত হয়। এরপর ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কাশ্মীর থেকে সমস্ত হিন্দুদের মেরে, মা-বোনদের ধর্ষণ করে, মন্দির ভেঙ্গে,বাড়ি-ঘর লুঠ করে ৬-৭ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে উদ্বাস্তু করা হয়। secular টুকরো ভারতে হিন্দু নিজের মাতৃভূমিতে refugee হলো। সব থাকার পরেও, সব হারিয়ে জন্মু আর দিল্লির ফুটপাতে পড়ে থাকতে হলো; সেদিন কেউ ট্রেন-বাস পোড়ায়নি। কেউ পুলিশের উপর গুলি-বোমা ছোঁড়েনি। কোনো কবি, ইতিহাসবিদ, লেখক মাইনরিটির জন্য কিছু ত্যাগ করেনি। কোনো ইউনিভার্সিটির ছেলেরা মিছিল করেনি। কারণ? কারণ হিন্দুর জীবন হলো গরু-ছাগলের জীবন। কতোগুলো কাটা গেল তাতে কী?

এবারে কেউ উদ্বাস্তু হয়নি। কিন্তু প্রগতিশীলরা গর্ত থেকে বেরিয়েছে।বলছে উদ্বাস্তু হতে পারে। হয়নি। কিন্তু হতে তো পারে ! তাই আগুন জ্বলছে।

বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে ক্রমাগত হিন্দু মরেছে। মুসলমানের হাতে মরেছে। ধর্মের কারণে মরেছে। যে জাতি অতীতে ইহুদী,পার্সিসহ সমস্ত নিপীড়িত জাতির মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে; সেই জাতি যখন পাশের দেশে উদ্বাস্তু হয়েছে, নিজের স্বাধীন দেশে উদ্বাস্তু হয়েছে আমার দেশে আগুন জ্বালেনি। কেন জ্বলেনি? কারণ হিন্দুর জীবন গরু-ছাগলের জীবন।

তিব্বতের দলাই লামা এবং তার প্রায় ২-৩ লাখ বৌদ্ধ অনুগামী যখন দেশের নাগরিকত্ব পায় বা শুধু উগান্ডার মুসলিমরা যখন নাগরিকত্ব পায়, তখন কেউ বলেনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দাও‌। কেন বলেনি? কারণ হিন্দুর জীবন গরু-ছাগলের জীবন ।

এই দেশে সহিষ্ণু শুধু হিন্দু। অন্য ধর্মটির স্বার্থে এক চিলতে পরিমাণ আঘাত লাগলে তারা দাঁত-নখ বার করে। দাঁত-নখ বের যাতে না করে তাই তাকে ক্রমাগত তোষণ করতে হয়। নিজেদের ধর্মীয় শিক্ষা (মাদ্রাসা শিক্ষা), কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন (শরিয়া আইন) , হজের জন্য সাবসিডি, ইমামদের ভাতা, এয়ারপোর্টে নামাজ পড়ার জায়গা, খাবারকে মন্ত্র পড়ে শুদ্ধ করার জন্য অন্য ধর্মের মানুষদেরকেও ট্যাক্স দিতে হয় (হালাল মাংস)। এতো কিছুর পরেও তাদের লালসার গহ্বর পূর্ণ হয়? বা তারা সন্তুষ্ট হয়? হয় না। সংখ্যায় একটু বেশি হলেই অন্য ধর্মকে গিলে খায়। ইরানে পার্সি, আফগানিস্তানে বৌদ্ধ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দু এবং টুকরো স্বাধীনতার পর কাশ্মীরের হিন্দুদের গিলে খেয়েছে। এদের খিদে মিটবে কিসে?

যাক গে সে কথা। “হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই”।
মাঝে মাঝে শুধু ভূমি সংস্কার চাই।

আমরা আর ওরা

সৌভিক দত্ত

প্রত্যেকটা দিন একই গতানুগতিক ভাবে কেটে যাচ্ছে।
প্রত্যেকটা নিষ্ফল অথচ ঘটনাবহুল দিন

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি, হাত মুখ ধুই‚
অলস হাতে খুলে দিই নেটের দুনিয়া।
ফোনের স্ক্রিন জুড়ে থাকে নেকড়েদের জান্তব উল্লাসের চিহ্ন।
আমাদের স্ট্যাটাসগুলো একে একে বদলে যায় ওদেরই সাথে‚
কখনো স্ট্যাটাস আসে ইসলামপুর নিয়ে, কখনো দেগঙ্গা, কখনো মেটিয়াবুরুজ,
কখনো উলুবেড়িয়া – সন্তোষপুর;
আর কখনো বা হতভাগ্য রোহিত তাঁতী।

ছোটখাটো দু’একটা মার্ডার হলে ছোটোখাটো একটা স্ট্যাটাস ছাড়ি‚
বড় কিছু ঘটলে হয়তো বা বড় একটা রচনাবিশেষ ।

ফেসবুকে হোয়্যাটস্যাপে হুঙ্কার ছাড়ি‚ বদলা নেবো। ভুলছি না। থামবো না।
লাইক, শেয়ার আর কমেন্টে প্রশংসার বহরে ভেসে যাই এরপর!
দারুণ বলেছো ভাই।
সাথে আছি ভাই।
সাবধানে থেকো ভাই।

তারপর পালে পালে এগিয়ে আসে দু’পেয়ে শুয়োরেরা –
আসলেই এমন ঘটেছে তো নাকি সবই অমিত শাহের চাল?
সত্যিই জেহাদীরা মেরেছে তো? শুনলাম ভেতরে নাকি পরকীয়াঘটিত কেস ছিলো?
কোথায় কে মরছে তা নিয়ে এত লাফালাফি কিসের?
আহা! মানলাম এইভাবে মারা ঠিক হয়নি
কিন্তু লোকটা নাকি আর এস এস করত‚ এটা কি ঠিক?
বাংলায় কেরল দাওয়াই শুরু হয়ে গেছে‚ চাড্ডিরা এবার সাবধানে থাক‚ কাউকে ছাড়া হবেনা।
না এটা কোনো জেহাদী আক্রমণ না‚ এটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণমানুষের অভ্যুত্থান!

এইভাবেই শুয়োরের সাথে লড়তে গিয়ে রাস্তা থেকে কাদায় নেমে পড়ি।
হুঁশ ফিরলে নিজেকে খুঁজে পাই কাদার মধ্যে চতুষ্পদদের জান্তব উল্লাসের মাঝে।
ওরা একটা মানুষকে ওদের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে‚ তাই উল্লাস।

রাষ্ট্রের কাছে মিনমিন করে গিয়ে বলি, বাঁচান আমাদের!
রাষ্ট্র ভুরু কুঁচকে বলে, সংখ্যাগুরুদের একটা দায়িত্ব আছে তো‚ নাকি?

সরকারের কাছে গিয়ে আব্দার জানাই, বিচার চাই।
সরকার চোখ রাঙ্গিয়ে বলে, প্রতিবাদ করছ? ফেসবুকে লোক জানাচ্ছ? আচ্ছা দাড়াও ইন্টারনেট বন্ধ করি আগে।

বিরোধীদের কাছে মিনমিন করে গিয়ে বলি, কিছু একটা করুন।
বিরোধী দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে এসো গান্ধী সংকল্প যাত্রায় এসো‚ একজনের গলায় কোপ খেলে অন্যজন গলা বাড়িয়ে দিতে শেখো।

লালপার্টির কাছে গিয়ে বলি‚ বাঁচান আমাদের‚ আমরা ধর্মান্ধদের হাতে আক্রান্ত।
ওরা একসাথে উত্তর দেয়‚ ঘোৎ ঘোৎ ঘোৎ!

মিডিয়ার কাছে ছুটে যাই! ছুটে যাই বুদ্ধিজীবীদের কাছে । দুহাত জোড় করে বলি‚ আমাদের কথাও মাঝেমধ্যে বলুন মানুষকে!
দুজনে একসাথে লেজ নেড়ে বলে ওঠে‚ পেট্রোডলারের বিনিময় মূল্য কত জানিস এখন?

জনগণের কাছে মিনমিন করে গিয়ে বলি, প্রতিবাদ করুন।
তারা চোখ উল্টে বলে প্রয়োজনই বা কি ওদের সাথে ঝামেলা করার? জানো না ওদের রক্ত গরম?

জেনে আমি উৎফুল্ল হই। জ্ঞানের বহরে আমার ওজন বাড়ে।
আর ফোন হাতে তুলে আবার হুঙ্কার ছাড়ি।
প্রতিবাদ চলবে‚
দ্বিতীয় নোয়াখালী হতে দেবোনা।
আমার মাটি আমার মা‚
আরবী উর্দুর হবেনা।

তারপর রাতের বেলা ভরপেট ভাত খেয়ে ঘুমাতে যাই।

পরদিন ঘুম থেকে উঠি, হাত মুখ ধুই
অলস হাতে খুলে দিই নেটের দুনিয়া।
ফোনের স্ক্রিন জুড়ে থাকে নেকড়েদের জান্তব উল্লাসের চিহ্ন।
হয়তো বা নিজের অলক্ষ্যেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি আমি এখনো অক্ষত আছে দেখে।
তারপর লিখতে শুরু করি
কখনো ইসলামপুর নিয়ে, কখনো দেগঙ্গা, কখনো মেটিয়াবুরুজ,
কখনো উলুবেড়িয়া – সন্তোষপুর
আর কখনো বা হতভাগ্য রোহিত তাঁতী…

( বিদেশী কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত)

CAB নিয়ে অল্প কিছু কথা

প্রণয় রায়

আমি মিশ্র এলাকার মানুষ। ওপার আর এপারের লোক এখানে পাশাপাশি থাকে। তাই, CAB কেন দরকার সেটা আমি খুব ভাল করেই জানি। আমি যে এলাকাতে থাকি, সেখানকার ৭০-৮০ % মানুষ কোন না কোন সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে বসবাস করছে। ১৯৭১ সাল অব্দি রিফিউজি হিসবে বা বিনিময়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছে। পরবর্তীতে যারা এসেছে সকলেই বিভিন্ন ভাবে অবৈধ উপায় অবলম্বন করে নাগরিক হয়েছে। কেও অন্যকে বাবা মা সাজিয়ে, কেও কাউকে ঠাকুরদাদা সাজিয়ে, নেতাদের ধরে, সরকারের আধিকারিকদের মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে, কেউ বা আত্মীয়স্বজন থাকলে তাদের সাহায্যে। কেউই সরকারের কাছে আবেদন করে হয়নি, কেননা সেরকম উপায় ছিল না সেভাবে। ফলে এত মানুষ এখানে নাগরিকত্ব পেল, তার প্রমান ভারতের সরকারের কাছে নেই। আবার বাংলাদেশের থেকে অত্যাচারিত হয়ে এসেছে, তার জন্য বাংলাদেশের সরকারকেও লজ্জায় পড়তেও হয়নি, প্রশ্নের মুখেও পড়েনি আজ অব্দি। কিন্তু ৩২% থেকে সেখানে ৮% এ নেমে এলো হিন্দু জনসংখ্যা। কি অদ্ভুত না??

অনেকেই ভাবছে যে করেই হোক নাগরিক তো হয়েছে, তাহলে নতুন করে আবার কিসের নাগরিকত্ব দেবে?? এখানেই মজা লুকিয়ে আছে… সরকারের বিভিন্ন দফতর নথিপত্র দেখলে ঠিক বুঝতে পারে, কে প্রকৃত নাগরিক, কে অবৈধ ভাবে এসেছে। সেজন্য প্রতিনিয়ত এদেরকে মোটা টাকা নিয়ে ঘুরতে হয়। এখানে এসে ক্লাস এইট বা নাইনে ভর্তি হবে, আগের পড়াশোনার নথি নেই, দাও স্কুল কমিটিকে ঘুষ। প্রাইমারি স্কুলের নকল সার্টিফিকেট বানাও, দাও সেখানে ঘুষ। এগুলো কখনো ৫ হাজার থেকে ২০-৩০ হাজার অব্দি হয়ে যায়। এখানেও নিস্তার নেই, বানাও নকল বার্থ সার্টিফিকেট সেখানেও এরকম ঘুষ। তারপরে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড করতেও একই রকম ঘুষ দিয়ে যেতে হবে। কেননা সবাই জানে এরা অবৈধ ভাবে নাগরিক হয়েছে। কারোও বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলার উপায় নেই এদের। এরপর সরকারি চাকরি পাওয়া বা পাসপোর্ট বানাতে গেলে পড়তে হবে DIB র খপ্পরে, সেখানেও চার্জটা কারও কারও ৩০-৪০ হাজার অব্দিও পৌছিয়ে যায়, ন্যূনতম ৫ হাজার। ঠিকমতো না হলে তারা বার্থ সার্টিফিকেট উক্ত পঞ্চায়েতে, স্কুল সার্টিফিকেট স্কুলে রিভিউ করতে পাঠাবে। অতোদিনে আগের কমিটির পরিবর্তন হয়েছে। তাই সেখানেও দাও আবার ঘুষ। এতো কিছুর পরেও এদের মনে ভয় কাটেনা। কোনও ডিপার্টমেন্টর বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারেনা। এভাবেই নাগরিক হয়েও অত্যাচারিত হতে হয় এদের প্রতিনিয়ত।

এবার CAB আসছে। এরা আবেদন করে, সার্টিফিকেট নিয়ে স্বগর্বে মাথা উঁচু করে বলবে “আমরা ভারতের নাগরিক। ” শুধু তাই নয়, আবেদনের সংখ্যা যত বাড়বে, ততই চাপে পড়বে বাংলাদেশ সরকার। এতোদিন পৃথিবীর অন্যদেশ জানতোই না এই গোপন অত্যাচারের কথা। ভারতে গোপনে নাগরিক হয়ে, এরা চিৎকার করে সেকথা জানাতে পারেনি ভয়ে। ভারতের কোনও সরকার, কোন রাজনৈতিক দল এদের হয়ে গলা ফাটায়নি আজ অব্দি। না বাংলাদেশের কোনও মানবতাবাদী সংগঠন পাশে দাড়িয়েছে এদের। এবার সকলে জানবে…. এই পরিস্থিতিটা কলকাতা বা বর্ডার এলাকা থেকে দূরে বসবাস করা মানুষেরা বুঝবে না কোনও দিন…

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯

স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-কে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বারা দুবার সংশোধনের প্রচেষ্টা করা হয়। প্রথমটি “নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি ২০১৬” এবং দ্বিতীয়টি “নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯”। এই ২০১৬-র নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি অনুসারে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ভারতের নাগরিক হবার পদ্ধতি ছিল খুবই জটিল। এতটাই সমস্যাজনক ছিল যে এই বিষয়ক যৌথ সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট রায় দেয় যে এর ফলে মাত্র ৩১,৩১৩ জন মানুষ ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। সেই প্রথম সংশোধনীর সরল বঙ্গানুবাদ আগের পর্বে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রথম সংশোধনীর এই সব জটিলতা ও সমস্যা এড়াতেই নতুন ভাবে দ্বিতীয় সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীকে প্রথম সংশোধনীর তুলনায় অনেকটাই ত্রুটিমুক্ত বলা যায়। তবুও, অহেতুক বিতর্কের মুখে পড়েছে সদ্য পাস হওয়া “নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯”। এই সংশোধনী বিষয়ে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা অবসানের লক্ষ্যে ভারত সরকারের নিজস্ব সংবাদপত্রে প্রকাশিত আইনটির সরল বাংলা অনুবাদ নীচে দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব সংবাদপত্র “দি গেজেট অফ ইন্ডিয়া”-তে এটি প্রকাশ করেছেন ভারত সরকারের সচিব ডাঃ জি. নারায়ণ রাজু।

তবে আইনটি পড়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে একটু পরিষ্কার ধারণা করে নেওয়া দরকারী। এই আইনে “স্বাভাবিকী করণ”-এর (naturalization) কথা বলা হয়েছে। “স্বাভাবিকী করণ” হল সেই সব মানুষের জন্য যারা এই দেশের আইনানুগ নাগরিক নন কিন্তু বহু বছর ধরে এই দেশেই রয়ে গেছেন। এবং এতদিন ধরে এই দেশে থাকতে থাকতে এদেশের জল-মাটি-রাজনীতির সাথে স্বাভাবিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান-এর ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেসব মানুষ ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪-র আগে থেকে ভারতেই রয়ে গেছেন; তাদেরকে “স্বাভাবিকী করণ”-এর ন্যায্য অধিকার দিতেই এই আইন। শুধু তাইই নয়, এই সব মানুষেরা সেইদিন থেকেই ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন, যেদিন তারা ভারতে প্রবেশ করেছেন।

এছাড়া এই আইনে “অন্তর্বতী সীমা” (inner line) অঞ্চলের কথাও বলা আছে। অন্তর্বর্তী সীমা অঞ্চলে এই আইন প্রযোজ্য হবে না। এই অঞ্চলগুলি ভারত সরকার দ্বারা বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত কিছু অঞ্চল। এসব অঞ্চলে ঘুরতে যেতেও যে কোন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদের “ইনার লাইন পারমিট” (ILP) নামক বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। এছাড়া “ভারতের বহিঃ-নাগরিক” বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে বিদেশে বসবাসরত সেইসব মানুষদের কথা, যারা বর্তমানে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ভারতে বসবাস এবং কাজ করার ক্ষেত্রে এঁরা বিশেষ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন।

আইন ও বিচার মন্ত্রক

নতুন দিল্লী, ১২ ই ডিসেম্বর ২০১৯, ২১শে অগ্রহায়ণ ১৯৪১ (শকাব্দ)

নিম্নলিখিত সংসদীয় আইনটি ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছে এবং সেটি সাধারণ তথ্যের জন্য প্রকাশিত হল।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯

২০১৯-এর ৪৭ নম্বর

[১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯]

নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-কে পুনরায় সংশোধনের লক্ষ্যে এই আইন।

(সংক্ষিপ্ত শিরোনাম এবং ভূমিকা)

ভারতীয় গণরাষ্ট্রের ৭০ তম বর্ষে সংসদ দ্বারা প্রণীত হোক যে:-

১। (১) এই আইনটিকে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ বলা যেতে পারে।

(২) কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের নিজস্ব সংবাদপত্রে নির্দেশিকা জারির দিন থেকেই এই আইনটি বলবৎ হবে।

(২ নম্বর ধারার সংশোধনী)

২। নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-র (এরপর থেকে মূল আইন হিসেবে উল্লেখিত) ২ নম্বর ধারার (১) নম্বর উপধারায় (খ) শর্তে, নিম্নলিখিত নিয়ম যুক্ত করা হল। যেগুলি হল-

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানের কোন হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান মানুষ, যারা ৩১ শে ডিসেম্বর ২০১৪ র আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, এবং যাদেরকে কেন্দ্র সরকার দ্বারা কিংবা পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন ১৯২০-র ৩ নম্বর ধারার (২) উপধারায় (গ) শর্তে অথবা বিদেশি আইন ১৯৪৬-এর নিয়ম প্রযুক্ত করে বা এদের অন্তর্ভুক্ত কোন নিয়ম বা আদেশ জারি করে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে এই আইনের আওতায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না।

(৬খ নামক নতুন ধারার অন্তর্ভুক্তি)

৩। মূল আইনের ৬ক ধারার পরে নিম্নলিখিত ধারাটি যুক্ত করা হল। যেগুলি হল:-

৬খ। (১) কেন্দ্র সরকার বা তাঁদের নির্দেশিত কোন অধিকারী, কেন্দ্র সরকারের হয়ে, এই বিষয়ের নির্দিষ্ট উপায়, শর্ত, বিধিনিষেধ মেনে, এই বিষয়ে আবেদনের ভিত্তিতে, সেই সব মানুষদের নথিভুক্তির শংসাপত্র বা স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র দিতে পারেন, যাদের ব্যাপারে ২ নম্বর ধারার (১) নম্বর উপধারায় (খ) শর্তে উল্লিখিত নিয়মে নির্দেশ দেওয়া আছে।

(২) ৫ নম্বর ধারায় উল্লেখিত শর্ত পূরণ হলে বা তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত নিয়ম অনুসারে স্বাভাবিকী করণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হলে, যে মানুষটি নথিভুক্তির শংসাপত্র পেয়েছেন বা (১) নম্বর উপধারা অনুসারে স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র পেয়েছেন, তাঁরা সেদিন থেকেই ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন, যেদিন তারা ভারতে প্রবেশ করেছেন।

(৩) নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯ জারি হবার দিন থেকেই কোন মানুষের বিরুদ্ধে এই ধারায় বর্ণিত নাগরিকত্ব বা অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে চলা যে কোন মামলা তার নাগরিকত্ব প্রাপ্তির দিন থেকেই বাতিল হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে সেই মানুষটি এই ধারায় নাগরিকত্বের আবেদন করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই কারণে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে অথবা কেন্দ্র সরকার বা তাঁদের নির্দেশিত সরকারের হয়ে কাজ করা কোন অধিকারী এই কারণে কারো আবেদন বাতিল করবেন না যদি দেখা যায় যে এই ধারা অনুসারে বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে সেই মানুষটি নাগরিক হবার যোগ্য।

আরো উল্লেখ্য যে এই ধারা অনুযায়ী যে মানুষটি নাগরিকত্বের আবেদন করছেন, ঐ আবেদন গৃহীত হবার তারিখের আগের থেকে সেই মানুষটি যে সব সুবিধা এবং অধিকার ভোগ করছিলেন, এই আবেদন করার জন্য, সেগুলি থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না।

(৪) এই ধারায় বর্ণিত কোন কিছুই সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগে উল্লিখিত আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরার উপজাতি অঞ্চলে এবং বঙ্গীয় পূর্ব সীমান্ত বিধেয়ক ১৮৭৩-এ নির্দেশিত “অন্তর্বর্তী সীমা” অঞ্চলে প্রযুক্ত হবে না।

(৭ঘ ধারার সংশোধনী)

৪। মূল আইনের ৭ ঘ ধারাতে,-

(১) শর্ত (ঘ) এর পর, নিম্নলিখিত শর্তটি সংযুক্ত করা হল, যেগুলি হল:-

“(ঘক) ভারতের বহিঃ-নাগরিক পত্রের ধারকরা যদি এই বিধির কোন নিয়ম বা ওই সময়ে প্রচলিত কেন্দ্র সরকার কর্তৃক নিজস্ব সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দ্বারা নির্দেশিত অন্য কোন আইন লঙ্ঘন করে থাকেন; অথবা”;

(২) শর্ত (চ) এর পরে নিম্নলিখিত নিয়মটি সংযোজিত হল, যেগুলি হল:-

“যতক্ষণ না ভারতের বহিঃ-নাগরিক পত্র ধারকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথোপযুক্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই ধারার বলে কোন আদেশ জারি করা যাবে না।”

(১৮ নম্বর ধারার সংশোধনী)

৫। মূল আইনের ১৮ নম্বর ধারার (২) নম্বর উপধারায় (গগ) শর্তের পরে নিম্নলিখিত শর্তটি যুক্ত হবে। যেগুলি হল:-

(গগঝ) নথিভুক্তির শংসাপত্র বা স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র দেবার শর্ত, বিধিনিষেধ ও উপায় ৬খ ধারার (১) নম্বর উপধারা অনুসারে

(তৃতীয় ভাগের সংশোধনী)

৬। মূল আইনের তৃতীয় ভাগের (ঘ) শর্তে, নিম্নলিখিত নিয়ম সংযুক্ত হল, যেগুলি হল:-

“বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অর্থাৎ হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে, উক্ত শর্তের হিসেবে, ভারত সরকারের অন্তর্গত বাস বা চাকরির গড় প্রমান, “এগারো বছরের কম নয়” এর বদলে “পাঁচ বৎসরের কম নয়” হিসেবে পড়তে হবে।”

(মূল ইংরেজি থেকে সরল বাংলায় অনূদিত)

Blog at WordPress.com.

Up ↑

Design a site like this with WordPress.com
Get started