বাঙালি হিন্দুর বিশ্বমানবতার ঘাটে বিসর্জনের বাজনা

উত্তম দেব

বাঙালি হিন্দুর বিশ্বমানবতা, ঔদার্য এবং বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষতা নিয়ে যেমন সংশয় নেই তেমনি বাঙালি হিন্দুর স্বজাতি বিমুখতা নিয়েও কোন‌ও সন্দেহ নেই। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বর্ণহিন্দুরা ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া জগতে আর কিছু বোঝে না। এরা উপরে উঠলে, দুটো পয়সার মুখ দেখলে জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো এমনকী মায়ের পেটের ভাইবোনদের‌ও চেনে না। গোষ্ঠীপ্রীতি তো দূরের কথা।

বাঙালি বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্যকে খারাপ চোখে দেখে এসেছে। দুই পাতা ইংরেজি বিদ্যা শিখে সরকারি চাকরি লাভকে মোক্ষ ভেবেছে এতকাল। বাঙালির ঘাড়ে সবার আগে ইংরেজ চেপেছিল। তাই ইংরেজ স‌ওদাগরের আপিসে চাকরি করে মাসান্তে দুটো টাকা নিশ্চিত মাইনে তার সঙ্গে ভাগ্য ভালো থাকলে আর‌ও দুটো পয়সা উপরি কামাই – এই স্বল্প অথচ সহজ প্রাপ্তির লোভ থেকেই বাঙালি হিন্দুর চাকরি প্রীতি। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের আগে পর্যন্ত এই প্রীতি কাটানো তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। বাঙালি বর্ণহিন্দু সবার আগে রাতের অন্ধকারে পূর্ববঙ্গে নিজের ভিটে ছেড়েছে চোরের মতো। এমনকী নিজের প্রতিবেশী ও আত্মীয়কে পর্যন্ত না জানিয়ে।

শেষ পর্যন্ত লড়েছিল নিম্নবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা। যদিও শেষতক তারাও সংখ্যাগুরু দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই পায় নি। তবুও তারা মাটি কামড়ে আপন জমি রক্ষা করেছিল বলেই এখনও বাংলাদেশে ৮-৯ শতাংশ হিন্দু টিকে আছে। আমি নিজে জন্মসূত্রে বর্ণহিন্দু। বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মতুয়াদের মধ্যে‌ই দেখছি কেবল সংঘশক্তি আছে। এবং আজকে তারা এর রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড‌ও পাচ্ছে। সংঘশক্তি ব্যতীত কোন‌ও জনগোষ্ঠীর কপালে রাষ্ট্রের খাতির জোটে না।

নিজের জাতিগোষ্ঠীকে দেউলিয়া এবং দুর্বল বানিয়ে বিশ্বমানবতার নামে খঞ্জনি বাজানোর আরেক নাম বিনাশ। বাঙালি হিন্দুর ভেতরে এই বিনাশবুদ্ধি বড় মারাত্মক। বলতে দ্বিধা নেই একটা দীর্ঘ সময় বামপন্থীরা বাঙালি হিন্দুর এই বিনাশবুদ্ধির গোড়ায় ধূপধুনো দিয়েছে। উদারবাদ ততক্ষণই উত্তম যতক্ষণ আমার জন্য উত্তম। কিন্তু যখন উদারবাদ আপন সর্বনাশের কারণ তখন তার মতো অধম জিনিস আর নেই। এটা পৃথিবীর সব জাতি বোঝে একমাত্র ব্যতিক্রম বিশ্বমানবিক বাঙালি। পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুর দুর্দশা দেখে পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বমানবতাবাদী, উদার প্রগতিশীলরা কখনও দু’ফোঁটা চোখের জল খরচ করেননি পাছে তাদের বিশ্বমানবতার পবিত্র আলখাল্লাটিতে সঙ্কীর্ণতার কাদা লাগে এই ভয়ে। অথচ গত তিরিশ বছরে বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের উদারবাদী বাঙালিও দু’ছটাক উৎকণ্ঠা প্রকাশের অনেক সুযোগ পেয়েছিল।

তবে সময় বড় নির্মম এবং বেশ খেয়ালিও বটে। এখন দুনিয়া জুড়ে বিশ্বপ্রেমের বদলে গোষ্ঠীপ্রেমের জোয়ার উঠেছে। এই জোয়ারে ভুবনবাদী বাঙালি হিন্দুও ইদানিং বিশ্বভুবনের হিত ভুলে বেসুরো গাইছে। পশ্চিমবঙ্গে বসে যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের অন্ধ বিরোধিতা করছেন তারা দেওয়ালের লিখন পড়তে পারছেন না। তবে শীঘ্রই পড়তে পারবেন। এই আইনের ভেতর মোদী-শাহের সূক্ষ্ম রাজনীতি নেই এটা বলার মতো মূর্খ আমি ন‌ই। কিন্তু এই আইন যে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের প্রতি ভারত সরকারের একটি স্বীকৃতি এটা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। ১৯৪৭-এর পর এই উপমহাদেশে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের মতো হতভাগা এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠী আর দ্বিতীয়টি নেই। বাঙালি হিন্দুর মনের নাউ সহসা আর বিশ্বমানবতার ঘাটে ভিড়ছে না।

(লেখকের মতামত একান্ত নিজস্ব)

NRC ও CAA – অস্তিত্ব সংকট থেকে বাঙ্গালীর উত্তরণের সুযোগ

অনিমিত্র চক্রবর্তী

গত বেশ কিছুদিন যাবৎ সমগ্র ভারতবর্ষে হিংসাজনিত কান্ডের ঘনঘটা চলছে। অবশ্যই NRC এবং CAA-2019 এর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদীদের বক্তব্য এই দুটি সদ্যপ্রতিষ্ঠিত চিন্তা ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মূল ভাবনার বিপরীতে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ কোন প্রকারের পরিবর্তন বা বিন্যাস যা ভারতবর্ষের প্রধান ধর্মীয় জনজাতি/হিন্দুকে (ভাষা নির্বিশেষে) এক নতুন পরিচিতি দেবে, শক্তিশালী করবে তা কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনস্বীকার্যভাবে, এর মধ্যে দায়ী প্রধানত হিন্দুর প্রাধান্যর প্রতি ঈর্ষা, অন্তর্নিহিত ঘৃণা এবং অবশ্যই হিন্দুর শোচনীয় সামাজিক পরিস্থিতি, স্থবিরতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, যা তান্ডব ও সুশীলতার যৌথ প্রয়োগকে যারপরনাই উৎসাহিত করেছে।

ধর্মের ভিত্তিতে ‘৪৭-এর দেশভাগের পর সৃষ্ট দুটি রাষ্ট্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্র – পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুসলমানদের। ২০১৯ এ এসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে হিন্দুদের, বিশেষত যারা ঐসলামিক সন্ত্রাসবাদ দ্বারা উৎপীড়িত। অসুবিধা কিসের ও কাদের?

অসুবিধা অবশ্যই তাঁদের যাঁরা দেশভাগের পর ভারতবর্ষের দুই পার্শ্বে দুটি ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করে ও সেখানকার সংখ্যালঘু, বিশেষত হিন্দুর, প্রতি যাবতীয় অকথ্য অত্যাচার করেও সন্তুষ্ট নন, হিন্দু-প্রধান ভারতবর্ষ ও তার শ্রী বৃদ্ধি তাদের একান্ত চক্ষুশূল। অবশ্যই স্মরণে রাখা প্রয়োজন, অখণ্ড বঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমান অঞ্চলগুলি ছাড়া যে ক্ষেত্র থেকে পাকিস্তান আন্দোলন ও তা প্রতিষ্ঠার জয়ধ্বনি উঠেছিল, সেই বিশেষ বিশেষ মুসলমান সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলি ভারতবর্ষেই রয়ে গেছে, পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে এই পাপ বিদেয় নেয়নি। এবং অবশ্যই সেখানে সেই ‘৪৭-এর পরাজয়জনিত ব্যথা ও হাহাকার এখনো বিদ্যমান। যদি এটি না বোঝা হয় তাহলে আমার, আপনার মূর্খামিতে কোন ছেদ পড়বে না, মূর্খ হিন্দু এক পরম সম্পদ প্রত্যেক শক্তির কাছে।

আমরা অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্রের হতভাগ্য হিন্দুরা গত কিছুদিন যাবৎ দেশব্যাপী হিংসার প্রকোপে থেকে যা বুঝলাম (অবশ্যই এক অতি পুরাতন সত্য) – রাষ্ট্র এবং তার শাসনপ্রণালী ততক্ষণই কার্যকরী যতক্ষণ ব্যক্তি কায়মনোবাক্যে রাষ্ট্রের সাথে রয়েছে। আমাদের হিন্দুদের সত্যনিষ্ঠা, সর্বদা রাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীলতা সদা পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অপাংক্তেয়রূপে প্রমাণিত বহুদিন ধরেই। কিন্তু আমাদের complacency/সদা সন্তুষ্টি সেটি আমাদের অনুভব করতে দেয়না, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা তাকে দৃঢ়তর করে প্রত্যেকদিন, আমরা ক্রমশ পরিবর্তিত হই একটি জড়পদার্থে।

তাহলে করণীয় কি? প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে সমস্যাটি কোথায় এবং কে আমার পক্ষে, বিপক্ষে। ১৯৪৭ থেকেই ভারতে একটি ধারণা বদ্ধমূল করা হয়েছে – সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ একটি সাময়িক ঘটনা ও তা বহু সময়ে কার্যকারণ ব্যতীত হয়। যদিও মূল বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন – প্রত্যেক সংঘর্ষ স্বার্থ স্থাপনের একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ। একটি আক্রমণ ঘটবে, তার ধারাবাহিকতায় আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে প্রতিকার হেতু পথে নামব। প্রশাসন তখনই আমাকে স্তব্ধ করার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করবে এবং হঠাৎ এক পক্ষের উদয় হবে যাঁরা বলবেন, “আমরা নাস্তিক, ধর্মের বিরুদ্ধে কিন্তু এসব থামানোর জন্যই পথে নেমেছি। ধরো হাতে হাত, আজ থেকে আমরা সবাই ভাই।” ঝামেলা শেষ হওয়ার চমকপ্রদ গতিতে মুগ্ধ আমি জিজ্ঞেস করি না, “আগের দিনগুলোয় যখন একনাগাড়ে আক্রমণ হচ্ছিল আমার বিরুদ্ধে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?” এবং এই ধারাটিই চলে যায় অবলীলাক্রমে। আজ থেকে ৯০ বছর আগে ১৯৩০ সালে প্রকাশিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ঢাকার পৈশাচিক দাঙ্গার ক্ষেত্রে যা সত্য তা ২০১৯ – এও সত্য। Hindus do remain on the receiving end always…. and there has been no single exception to this even yet…

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন – ২০১৯ পাশ করা হয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নির্যাতিত সংখ্যালঘু অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্যরা যাঁরা সম্পূর্ণরূপে নিরুপায় হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁদের স্বার্থে – তাঁদের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য। যা শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই বুঝবেন এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধং দেহি মনোভাবে বিরোধিতায় মগ্ন এবং নেতৃত্বে তথাকথিত বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা।

এঁরা কারা? তাঁরা যাঁরা ব্যক্তি হিন্দু ও হিন্দু সমাজের উপর একমাত্র ধর্মীয় কারণে অকথ্য অত্যাচার হলে থাকেন নিশ্চুপ।

২০০১ সালে বাংলাদেশে হিন্দু জাতির উপরে নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন; তার ডঙ্কা সুদূর ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্কে বাজলেও বাজেনি পার্শ্ববর্তী কলকাতা তথা ভারতে। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার দেউলা গ্রামে তৎকালীন ১৪-বছর বয়স্ক পূর্ণিমা শীলের উপর ৩০ জন ইসলামী সন্ত্রাসীর গণধর্ষণে। পূর্ণিমার মা শ্রীমতী বাসনা রাণী শীল কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “আমার মেয়ে ছোট। তোমরা বাবা এক এক করে যাও।” অবশ্য এই কথা শোনার পর বাসনা দেবীর ওপরে প্রচন্ড অত্যাচার করলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ধর্মের নামে এই অমানুষিক নির্যাতন বাংলাদেশের সীমিত অংশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সৃষ্টি করলেও ভারতবর্ষের বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ছিলেন তাপ উত্তাপহীন। তাঁদের অনেকেই এটিকে ভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় রূপে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন, অবশ্য গাজা স্ট্রিপ, প্যালেস্টাইনের বিষয়গুলি একান্তভাবেই ভারতীয় – তাই তাঁরা ক্ষোভে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। ভারতবর্ষের ক’টি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশের অকথ্য সংখ্যালঘু অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেষ্ট হয়েছে? প্রতিবাদ করছে? সামান্য হাতে গোনা ক’টি। বিশ্বমানবিক বামপন্থী অভিধানে, বার্ষিক সনদে বাংলাদেশের হিন্দু অত্যাচার নিয়ে একটি লাইনও লেখা হয়না।

২০০৭ থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চালচিত্রে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। এবং তার ৯৯.৯% ক্ষেত্রেই হিন্দুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সর্বাধিক। ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠলে বা নিতান্তই অস্তিত্বরক্ষার খাতিরে হিন্দু প্রতিরোধ গড়ে উঠলেই প্রশাসন অত্যধিক মাত্রায় সচেতন হয়ে পড়ে; এই সচেতনতা অবশ্য প্রথমদিকে থাকে একেবারেই অনুপস্থিত। এই সময়ে হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে কোনোদিন কোথাও লেফট লিবারেলদের দেখা গেছে? দেগঙ্গায়? না। নালিয়াখালী – ক্যানিং? না। কালিয়াচক? না। ধুলাগড়? না। বসিরহাট? না। অর্থাৎ সর্বত্র্যই selective secularism -এর দাপট ও প্রাদুর্ভাব। কিন্তু অহিন্দু স্বার্থ যেখানে বিঘ্নিত হতে পারে কিনা কেউ জানে না সেখানে এঁরা সচেষ্ট, প্রবল পরিমাণে উপস্থিত – হিন্দু স্বার্থের বিরুদ্ধে। এবং ভারতবর্ষে/ভারতীয় উপমহাদেশে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের ঊষালগ্ন থেকে এটাই চলে এসেছে – “…an undying legacy hell-bent to usurp the Sanatani heritage once and for all…”

এমতাবস্থায় আপনার করণীয় কি? আপনার নিজস্ব, সন্তান-সন্ততির স্বার্থকে নির্ধারণ করা। ‘নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ২০১৯’ পাশ হয়েছে এবং তা সবচেয়ে বেশী লাভদায়ক হবে বাঙ্গালী হিন্দুদের ক্ষেত্রে যাঁরা প্রাণের দায়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে ভারতবর্ষে শরণার্থী হয়েছিলেন দশকের পর দশক ধরে। জাতীয় পঞ্জীকরণ বাংলাদেশের মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে বিতাড়ন করতে সচেষ্ট হবে। অসমের অভিজ্ঞতায় বলা যায় এই ক্ষেত্রে কোনরূপেই কোন ধরণের সমঝোতা মেনে নেওয়া হবেনা, আসার কথা কেন্দ্রীয় সরকারও মানতে প্রস্তুত নন। এই কটি কথা বুঝতে খুব বেশী সময় লাগার কথা নয়। গত প্রায় ৭০ বছর ধরে যে পঙ্কিল আবর্তে রয়েছে বাঙ্গালী হিন্দু তা থেকে উত্তরণের জন্য যে কোন পন্থাকেই মেনে নিতে হবে। ইতিহাসে এসকল দৃষ্টান্ত অসংখ্য রয়েছে – যেকোন শক্তিশালী জাতি প্রারম্ভে এরকম অবস্থার মধ্য দিয়েই যায় ও প্রত্যেকটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তার প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়।

অতএব, ভাবতে হবে, তার অনুশীলনও করতে হবে। নতুবা আজ থেকে ১০-১৫ বছর পরে আপন গৃহ থেকে উৎখাত হয়ে আপনাকেই ভাবতে হবে কোন লঙ্গরখানাটি সবচেয়ে নিকটে। সাথে থাকবে পঙ্গু অথবা নিহত পুত্র, ধর্ষিতা পুত্রবধূ ও কন্যা, নিহত স্ত্রীর দেহ। ভোট আপনার একটি গণতান্ত্রিক হাতিয়ার মাত্র। কিন্তু অস্ত্র/হাতিয়ার প্রয়োগ হয় মস্তিষ্কের চর্চার মাধ্যমে। নিজ ধর্ম, জাতির শত্রু বা মিত্রকে শনাক্ত করার গুরুদায়িত্ব আপনার, আমার ওপরেই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই হয় – ধ্বংসাত্মক রূপে।

CAA ও খিদে

অর্ণব কোলে

ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার পর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ভারত গঠিত হয়। এরপর ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কাশ্মীর থেকে সমস্ত হিন্দুদের মেরে, মা-বোনদের ধর্ষণ করে, মন্দির ভেঙ্গে,বাড়ি-ঘর লুঠ করে ৬-৭ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে উদ্বাস্তু করা হয়। secular টুকরো ভারতে হিন্দু নিজের মাতৃভূমিতে refugee হলো। সব থাকার পরেও, সব হারিয়ে জন্মু আর দিল্লির ফুটপাতে পড়ে থাকতে হলো; সেদিন কেউ ট্রেন-বাস পোড়ায়নি। কেউ পুলিশের উপর গুলি-বোমা ছোঁড়েনি। কোনো কবি, ইতিহাসবিদ, লেখক মাইনরিটির জন্য কিছু ত্যাগ করেনি। কোনো ইউনিভার্সিটির ছেলেরা মিছিল করেনি। কারণ? কারণ হিন্দুর জীবন হলো গরু-ছাগলের জীবন। কতোগুলো কাটা গেল তাতে কী?

এবারে কেউ উদ্বাস্তু হয়নি। কিন্তু প্রগতিশীলরা গর্ত থেকে বেরিয়েছে।বলছে উদ্বাস্তু হতে পারে। হয়নি। কিন্তু হতে তো পারে ! তাই আগুন জ্বলছে।

বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে ক্রমাগত হিন্দু মরেছে। মুসলমানের হাতে মরেছে। ধর্মের কারণে মরেছে। যে জাতি অতীতে ইহুদী,পার্সিসহ সমস্ত নিপীড়িত জাতির মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে; সেই জাতি যখন পাশের দেশে উদ্বাস্তু হয়েছে, নিজের স্বাধীন দেশে উদ্বাস্তু হয়েছে আমার দেশে আগুন জ্বালেনি। কেন জ্বলেনি? কারণ হিন্দুর জীবন গরু-ছাগলের জীবন।

তিব্বতের দলাই লামা এবং তার প্রায় ২-৩ লাখ বৌদ্ধ অনুগামী যখন দেশের নাগরিকত্ব পায় বা শুধু উগান্ডার মুসলিমরা যখন নাগরিকত্ব পায়, তখন কেউ বলেনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দাও‌। কেন বলেনি? কারণ হিন্দুর জীবন গরু-ছাগলের জীবন ।

এই দেশে সহিষ্ণু শুধু হিন্দু। অন্য ধর্মটির স্বার্থে এক চিলতে পরিমাণ আঘাত লাগলে তারা দাঁত-নখ বার করে। দাঁত-নখ বের যাতে না করে তাই তাকে ক্রমাগত তোষণ করতে হয়। নিজেদের ধর্মীয় শিক্ষা (মাদ্রাসা শিক্ষা), কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন (শরিয়া আইন) , হজের জন্য সাবসিডি, ইমামদের ভাতা, এয়ারপোর্টে নামাজ পড়ার জায়গা, খাবারকে মন্ত্র পড়ে শুদ্ধ করার জন্য অন্য ধর্মের মানুষদেরকেও ট্যাক্স দিতে হয় (হালাল মাংস)। এতো কিছুর পরেও তাদের লালসার গহ্বর পূর্ণ হয়? বা তারা সন্তুষ্ট হয়? হয় না। সংখ্যায় একটু বেশি হলেই অন্য ধর্মকে গিলে খায়। ইরানে পার্সি, আফগানিস্তানে বৌদ্ধ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দু এবং টুকরো স্বাধীনতার পর কাশ্মীরের হিন্দুদের গিলে খেয়েছে। এদের খিদে মিটবে কিসে?

যাক গে সে কথা। “হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই”।
মাঝে মাঝে শুধু ভূমি সংস্কার চাই।

CAB নিয়ে অল্প কিছু কথা

প্রণয় রায়

আমি মিশ্র এলাকার মানুষ। ওপার আর এপারের লোক এখানে পাশাপাশি থাকে। তাই, CAB কেন দরকার সেটা আমি খুব ভাল করেই জানি। আমি যে এলাকাতে থাকি, সেখানকার ৭০-৮০ % মানুষ কোন না কোন সময়ে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে বসবাস করছে। ১৯৭১ সাল অব্দি রিফিউজি হিসবে বা বিনিময়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছে। পরবর্তীতে যারা এসেছে সকলেই বিভিন্ন ভাবে অবৈধ উপায় অবলম্বন করে নাগরিক হয়েছে। কেও অন্যকে বাবা মা সাজিয়ে, কেও কাউকে ঠাকুরদাদা সাজিয়ে, নেতাদের ধরে, সরকারের আধিকারিকদের মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে, কেউ বা আত্মীয়স্বজন থাকলে তাদের সাহায্যে। কেউই সরকারের কাছে আবেদন করে হয়নি, কেননা সেরকম উপায় ছিল না সেভাবে। ফলে এত মানুষ এখানে নাগরিকত্ব পেল, তার প্রমান ভারতের সরকারের কাছে নেই। আবার বাংলাদেশের থেকে অত্যাচারিত হয়ে এসেছে, তার জন্য বাংলাদেশের সরকারকেও লজ্জায় পড়তেও হয়নি, প্রশ্নের মুখেও পড়েনি আজ অব্দি। কিন্তু ৩২% থেকে সেখানে ৮% এ নেমে এলো হিন্দু জনসংখ্যা। কি অদ্ভুত না??

অনেকেই ভাবছে যে করেই হোক নাগরিক তো হয়েছে, তাহলে নতুন করে আবার কিসের নাগরিকত্ব দেবে?? এখানেই মজা লুকিয়ে আছে… সরকারের বিভিন্ন দফতর নথিপত্র দেখলে ঠিক বুঝতে পারে, কে প্রকৃত নাগরিক, কে অবৈধ ভাবে এসেছে। সেজন্য প্রতিনিয়ত এদেরকে মোটা টাকা নিয়ে ঘুরতে হয়। এখানে এসে ক্লাস এইট বা নাইনে ভর্তি হবে, আগের পড়াশোনার নথি নেই, দাও স্কুল কমিটিকে ঘুষ। প্রাইমারি স্কুলের নকল সার্টিফিকেট বানাও, দাও সেখানে ঘুষ। এগুলো কখনো ৫ হাজার থেকে ২০-৩০ হাজার অব্দি হয়ে যায়। এখানেও নিস্তার নেই, বানাও নকল বার্থ সার্টিফিকেট সেখানেও এরকম ঘুষ। তারপরে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড করতেও একই রকম ঘুষ দিয়ে যেতে হবে। কেননা সবাই জানে এরা অবৈধ ভাবে নাগরিক হয়েছে। কারোও বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলার উপায় নেই এদের। এরপর সরকারি চাকরি পাওয়া বা পাসপোর্ট বানাতে গেলে পড়তে হবে DIB র খপ্পরে, সেখানেও চার্জটা কারও কারও ৩০-৪০ হাজার অব্দিও পৌছিয়ে যায়, ন্যূনতম ৫ হাজার। ঠিকমতো না হলে তারা বার্থ সার্টিফিকেট উক্ত পঞ্চায়েতে, স্কুল সার্টিফিকেট স্কুলে রিভিউ করতে পাঠাবে। অতোদিনে আগের কমিটির পরিবর্তন হয়েছে। তাই সেখানেও দাও আবার ঘুষ। এতো কিছুর পরেও এদের মনে ভয় কাটেনা। কোনও ডিপার্টমেন্টর বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারেনা। এভাবেই নাগরিক হয়েও অত্যাচারিত হতে হয় এদের প্রতিনিয়ত।

এবার CAB আসছে। এরা আবেদন করে, সার্টিফিকেট নিয়ে স্বগর্বে মাথা উঁচু করে বলবে “আমরা ভারতের নাগরিক। ” শুধু তাই নয়, আবেদনের সংখ্যা যত বাড়বে, ততই চাপে পড়বে বাংলাদেশ সরকার। এতোদিন পৃথিবীর অন্যদেশ জানতোই না এই গোপন অত্যাচারের কথা। ভারতে গোপনে নাগরিক হয়ে, এরা চিৎকার করে সেকথা জানাতে পারেনি ভয়ে। ভারতের কোনও সরকার, কোন রাজনৈতিক দল এদের হয়ে গলা ফাটায়নি আজ অব্দি। না বাংলাদেশের কোনও মানবতাবাদী সংগঠন পাশে দাড়িয়েছে এদের। এবার সকলে জানবে…. এই পরিস্থিতিটা কলকাতা বা বর্ডার এলাকা থেকে দূরে বসবাস করা মানুষেরা বুঝবে না কোনও দিন…

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯

স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-কে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বারা দুবার সংশোধনের প্রচেষ্টা করা হয়। প্রথমটি “নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি ২০১৬” এবং দ্বিতীয়টি “নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯”। এই ২০১৬-র নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি অনুসারে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ভারতের নাগরিক হবার পদ্ধতি ছিল খুবই জটিল। এতটাই সমস্যাজনক ছিল যে এই বিষয়ক যৌথ সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট রায় দেয় যে এর ফলে মাত্র ৩১,৩১৩ জন মানুষ ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। সেই প্রথম সংশোধনীর সরল বঙ্গানুবাদ আগের পর্বে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রথম সংশোধনীর এই সব জটিলতা ও সমস্যা এড়াতেই নতুন ভাবে দ্বিতীয় সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীকে প্রথম সংশোধনীর তুলনায় অনেকটাই ত্রুটিমুক্ত বলা যায়। তবুও, অহেতুক বিতর্কের মুখে পড়েছে সদ্য পাস হওয়া “নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯”। এই সংশোধনী বিষয়ে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা অবসানের লক্ষ্যে ভারত সরকারের নিজস্ব সংবাদপত্রে প্রকাশিত আইনটির সরল বাংলা অনুবাদ নীচে দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব সংবাদপত্র “দি গেজেট অফ ইন্ডিয়া”-তে এটি প্রকাশ করেছেন ভারত সরকারের সচিব ডাঃ জি. নারায়ণ রাজু।

তবে আইনটি পড়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে একটু পরিষ্কার ধারণা করে নেওয়া দরকারী। এই আইনে “স্বাভাবিকী করণ”-এর (naturalization) কথা বলা হয়েছে। “স্বাভাবিকী করণ” হল সেই সব মানুষের জন্য যারা এই দেশের আইনানুগ নাগরিক নন কিন্তু বহু বছর ধরে এই দেশেই রয়ে গেছেন। এবং এতদিন ধরে এই দেশে থাকতে থাকতে এদেশের জল-মাটি-রাজনীতির সাথে স্বাভাবিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান-এর ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেসব মানুষ ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪-র আগে থেকে ভারতেই রয়ে গেছেন; তাদেরকে “স্বাভাবিকী করণ”-এর ন্যায্য অধিকার দিতেই এই আইন। শুধু তাইই নয়, এই সব মানুষেরা সেইদিন থেকেই ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন, যেদিন তারা ভারতে প্রবেশ করেছেন।

এছাড়া এই আইনে “অন্তর্বতী সীমা” (inner line) অঞ্চলের কথাও বলা আছে। অন্তর্বর্তী সীমা অঞ্চলে এই আইন প্রযোজ্য হবে না। এই অঞ্চলগুলি ভারত সরকার দ্বারা বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত কিছু অঞ্চল। এসব অঞ্চলে ঘুরতে যেতেও যে কোন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদের “ইনার লাইন পারমিট” (ILP) নামক বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। এছাড়া “ভারতের বহিঃ-নাগরিক” বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে বিদেশে বসবাসরত সেইসব মানুষদের কথা, যারা বর্তমানে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ভারতে বসবাস এবং কাজ করার ক্ষেত্রে এঁরা বিশেষ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন।

আইন ও বিচার মন্ত্রক

নতুন দিল্লী, ১২ ই ডিসেম্বর ২০১৯, ২১শে অগ্রহায়ণ ১৯৪১ (শকাব্দ)

নিম্নলিখিত সংসদীয় আইনটি ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছে এবং সেটি সাধারণ তথ্যের জন্য প্রকাশিত হল।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯

২০১৯-এর ৪৭ নম্বর

[১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯]

নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-কে পুনরায় সংশোধনের লক্ষ্যে এই আইন।

(সংক্ষিপ্ত শিরোনাম এবং ভূমিকা)

ভারতীয় গণরাষ্ট্রের ৭০ তম বর্ষে সংসদ দ্বারা প্রণীত হোক যে:-

১। (১) এই আইনটিকে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ বলা যেতে পারে।

(২) কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের নিজস্ব সংবাদপত্রে নির্দেশিকা জারির দিন থেকেই এই আইনটি বলবৎ হবে।

(২ নম্বর ধারার সংশোধনী)

২। নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-র (এরপর থেকে মূল আইন হিসেবে উল্লেখিত) ২ নম্বর ধারার (১) নম্বর উপধারায় (খ) শর্তে, নিম্নলিখিত নিয়ম যুক্ত করা হল। যেগুলি হল-

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানের কোন হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান মানুষ, যারা ৩১ শে ডিসেম্বর ২০১৪ র আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, এবং যাদেরকে কেন্দ্র সরকার দ্বারা কিংবা পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন ১৯২০-র ৩ নম্বর ধারার (২) উপধারায় (গ) শর্তে অথবা বিদেশি আইন ১৯৪৬-এর নিয়ম প্রযুক্ত করে বা এদের অন্তর্ভুক্ত কোন নিয়ম বা আদেশ জারি করে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে এই আইনের আওতায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না।

(৬খ নামক নতুন ধারার অন্তর্ভুক্তি)

৩। মূল আইনের ৬ক ধারার পরে নিম্নলিখিত ধারাটি যুক্ত করা হল। যেগুলি হল:-

৬খ। (১) কেন্দ্র সরকার বা তাঁদের নির্দেশিত কোন অধিকারী, কেন্দ্র সরকারের হয়ে, এই বিষয়ের নির্দিষ্ট উপায়, শর্ত, বিধিনিষেধ মেনে, এই বিষয়ে আবেদনের ভিত্তিতে, সেই সব মানুষদের নথিভুক্তির শংসাপত্র বা স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র দিতে পারেন, যাদের ব্যাপারে ২ নম্বর ধারার (১) নম্বর উপধারায় (খ) শর্তে উল্লিখিত নিয়মে নির্দেশ দেওয়া আছে।

(২) ৫ নম্বর ধারায় উল্লেখিত শর্ত পূরণ হলে বা তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত নিয়ম অনুসারে স্বাভাবিকী করণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হলে, যে মানুষটি নথিভুক্তির শংসাপত্র পেয়েছেন বা (১) নম্বর উপধারা অনুসারে স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র পেয়েছেন, তাঁরা সেদিন থেকেই ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন, যেদিন তারা ভারতে প্রবেশ করেছেন।

(৩) নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯ জারি হবার দিন থেকেই কোন মানুষের বিরুদ্ধে এই ধারায় বর্ণিত নাগরিকত্ব বা অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে চলা যে কোন মামলা তার নাগরিকত্ব প্রাপ্তির দিন থেকেই বাতিল হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে সেই মানুষটি এই ধারায় নাগরিকত্বের আবেদন করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই কারণে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে অথবা কেন্দ্র সরকার বা তাঁদের নির্দেশিত সরকারের হয়ে কাজ করা কোন অধিকারী এই কারণে কারো আবেদন বাতিল করবেন না যদি দেখা যায় যে এই ধারা অনুসারে বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে সেই মানুষটি নাগরিক হবার যোগ্য।

আরো উল্লেখ্য যে এই ধারা অনুযায়ী যে মানুষটি নাগরিকত্বের আবেদন করছেন, ঐ আবেদন গৃহীত হবার তারিখের আগের থেকে সেই মানুষটি যে সব সুবিধা এবং অধিকার ভোগ করছিলেন, এই আবেদন করার জন্য, সেগুলি থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না।

(৪) এই ধারায় বর্ণিত কোন কিছুই সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগে উল্লিখিত আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরার উপজাতি অঞ্চলে এবং বঙ্গীয় পূর্ব সীমান্ত বিধেয়ক ১৮৭৩-এ নির্দেশিত “অন্তর্বর্তী সীমা” অঞ্চলে প্রযুক্ত হবে না।

(৭ঘ ধারার সংশোধনী)

৪। মূল আইনের ৭ ঘ ধারাতে,-

(১) শর্ত (ঘ) এর পর, নিম্নলিখিত শর্তটি সংযুক্ত করা হল, যেগুলি হল:-

“(ঘক) ভারতের বহিঃ-নাগরিক পত্রের ধারকরা যদি এই বিধির কোন নিয়ম বা ওই সময়ে প্রচলিত কেন্দ্র সরকার কর্তৃক নিজস্ব সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দ্বারা নির্দেশিত অন্য কোন আইন লঙ্ঘন করে থাকেন; অথবা”;

(২) শর্ত (চ) এর পরে নিম্নলিখিত নিয়মটি সংযোজিত হল, যেগুলি হল:-

“যতক্ষণ না ভারতের বহিঃ-নাগরিক পত্র ধারকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথোপযুক্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই ধারার বলে কোন আদেশ জারি করা যাবে না।”

(১৮ নম্বর ধারার সংশোধনী)

৫। মূল আইনের ১৮ নম্বর ধারার (২) নম্বর উপধারায় (গগ) শর্তের পরে নিম্নলিখিত শর্তটি যুক্ত হবে। যেগুলি হল:-

(গগঝ) নথিভুক্তির শংসাপত্র বা স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র দেবার শর্ত, বিধিনিষেধ ও উপায় ৬খ ধারার (১) নম্বর উপধারা অনুসারে

(তৃতীয় ভাগের সংশোধনী)

৬। মূল আইনের তৃতীয় ভাগের (ঘ) শর্তে, নিম্নলিখিত নিয়ম সংযুক্ত হল, যেগুলি হল:-

“বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অর্থাৎ হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে, উক্ত শর্তের হিসেবে, ভারত সরকারের অন্তর্গত বাস বা চাকরির গড় প্রমান, “এগারো বছরের কম নয়” এর বদলে “পাঁচ বৎসরের কম নয়” হিসেবে পড়তে হবে।”

(মূল ইংরেজি থেকে সরল বাংলায় অনূদিত)

Blog at WordPress.com.

Up ↑

Design a site like this with WordPress.com
Get started