নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯

স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-কে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বারা দুবার সংশোধনের প্রচেষ্টা করা হয়। প্রথমটি “নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি ২০১৬” এবং দ্বিতীয়টি “নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯”। এই ২০১৬-র নাগরিকত্ব সংশোধনী বিধি অনুসারে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ভারতের নাগরিক হবার পদ্ধতি ছিল খুবই জটিল। এতটাই সমস্যাজনক ছিল যে এই বিষয়ক যৌথ সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট রায় দেয় যে এর ফলে মাত্র ৩১,৩১৩ জন মানুষ ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। সেই প্রথম সংশোধনীর সরল বঙ্গানুবাদ আগের পর্বে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রথম সংশোধনীর এই সব জটিলতা ও সমস্যা এড়াতেই নতুন ভাবে দ্বিতীয় সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীকে প্রথম সংশোধনীর তুলনায় অনেকটাই ত্রুটিমুক্ত বলা যায়। তবুও, অহেতুক বিতর্কের মুখে পড়েছে সদ্য পাস হওয়া “নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯”। এই সংশোধনী বিষয়ে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা অবসানের লক্ষ্যে ভারত সরকারের নিজস্ব সংবাদপত্রে প্রকাশিত আইনটির সরল বাংলা অনুবাদ নীচে দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব সংবাদপত্র “দি গেজেট অফ ইন্ডিয়া”-তে এটি প্রকাশ করেছেন ভারত সরকারের সচিব ডাঃ জি. নারায়ণ রাজু।

তবে আইনটি পড়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে একটু পরিষ্কার ধারণা করে নেওয়া দরকারী। এই আইনে “স্বাভাবিকী করণ”-এর (naturalization) কথা বলা হয়েছে। “স্বাভাবিকী করণ” হল সেই সব মানুষের জন্য যারা এই দেশের আইনানুগ নাগরিক নন কিন্তু বহু বছর ধরে এই দেশেই রয়ে গেছেন। এবং এতদিন ধরে এই দেশে থাকতে থাকতে এদেশের জল-মাটি-রাজনীতির সাথে স্বাভাবিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান-এর ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেসব মানুষ ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪-র আগে থেকে ভারতেই রয়ে গেছেন; তাদেরকে “স্বাভাবিকী করণ”-এর ন্যায্য অধিকার দিতেই এই আইন। শুধু তাইই নয়, এই সব মানুষেরা সেইদিন থেকেই ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন, যেদিন তারা ভারতে প্রবেশ করেছেন।

এছাড়া এই আইনে “অন্তর্বতী সীমা” (inner line) অঞ্চলের কথাও বলা আছে। অন্তর্বর্তী সীমা অঞ্চলে এই আইন প্রযোজ্য হবে না। এই অঞ্চলগুলি ভারত সরকার দ্বারা বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত কিছু অঞ্চল। এসব অঞ্চলে ঘুরতে যেতেও যে কোন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদের “ইনার লাইন পারমিট” (ILP) নামক বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। এছাড়া “ভারতের বহিঃ-নাগরিক” বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে বিদেশে বসবাসরত সেইসব মানুষদের কথা, যারা বর্তমানে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ভারতে বসবাস এবং কাজ করার ক্ষেত্রে এঁরা বিশেষ কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন।

আইন ও বিচার মন্ত্রক

নতুন দিল্লী, ১২ ই ডিসেম্বর ২০১৯, ২১শে অগ্রহায়ণ ১৯৪১ (শকাব্দ)

নিম্নলিখিত সংসদীয় আইনটি ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছে এবং সেটি সাধারণ তথ্যের জন্য প্রকাশিত হল।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯

২০১৯-এর ৪৭ নম্বর

[১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৯]

নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-কে পুনরায় সংশোধনের লক্ষ্যে এই আইন।

(সংক্ষিপ্ত শিরোনাম এবং ভূমিকা)

ভারতীয় গণরাষ্ট্রের ৭০ তম বর্ষে সংসদ দ্বারা প্রণীত হোক যে:-

১। (১) এই আইনটিকে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ বলা যেতে পারে।

(২) কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের নিজস্ব সংবাদপত্রে নির্দেশিকা জারির দিন থেকেই এই আইনটি বলবৎ হবে।

(২ নম্বর ধারার সংশোধনী)

২। নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-র (এরপর থেকে মূল আইন হিসেবে উল্লেখিত) ২ নম্বর ধারার (১) নম্বর উপধারায় (খ) শর্তে, নিম্নলিখিত নিয়ম যুক্ত করা হল। যেগুলি হল-

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানের কোন হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান মানুষ, যারা ৩১ শে ডিসেম্বর ২০১৪ র আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, এবং যাদেরকে কেন্দ্র সরকার দ্বারা কিংবা পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন ১৯২০-র ৩ নম্বর ধারার (২) উপধারায় (গ) শর্তে অথবা বিদেশি আইন ১৯৪৬-এর নিয়ম প্রযুক্ত করে বা এদের অন্তর্ভুক্ত কোন নিয়ম বা আদেশ জারি করে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে এই আইনের আওতায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না।

(৬খ নামক নতুন ধারার অন্তর্ভুক্তি)

৩। মূল আইনের ৬ক ধারার পরে নিম্নলিখিত ধারাটি যুক্ত করা হল। যেগুলি হল:-

৬খ। (১) কেন্দ্র সরকার বা তাঁদের নির্দেশিত কোন অধিকারী, কেন্দ্র সরকারের হয়ে, এই বিষয়ের নির্দিষ্ট উপায়, শর্ত, বিধিনিষেধ মেনে, এই বিষয়ে আবেদনের ভিত্তিতে, সেই সব মানুষদের নথিভুক্তির শংসাপত্র বা স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র দিতে পারেন, যাদের ব্যাপারে ২ নম্বর ধারার (১) নম্বর উপধারায় (খ) শর্তে উল্লিখিত নিয়মে নির্দেশ দেওয়া আছে।

(২) ৫ নম্বর ধারায় উল্লেখিত শর্ত পূরণ হলে বা তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত নিয়ম অনুসারে স্বাভাবিকী করণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হলে, যে মানুষটি নথিভুক্তির শংসাপত্র পেয়েছেন বা (১) নম্বর উপধারা অনুসারে স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র পেয়েছেন, তাঁরা সেদিন থেকেই ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন, যেদিন তারা ভারতে প্রবেশ করেছেন।

(৩) নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯ জারি হবার দিন থেকেই কোন মানুষের বিরুদ্ধে এই ধারায় বর্ণিত নাগরিকত্ব বা অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে চলা যে কোন মামলা তার নাগরিকত্ব প্রাপ্তির দিন থেকেই বাতিল হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে সেই মানুষটি এই ধারায় নাগরিকত্বের আবেদন করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই কারণে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না যে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে অথবা কেন্দ্র সরকার বা তাঁদের নির্দেশিত সরকারের হয়ে কাজ করা কোন অধিকারী এই কারণে কারো আবেদন বাতিল করবেন না যদি দেখা যায় যে এই ধারা অনুসারে বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে সেই মানুষটি নাগরিক হবার যোগ্য।

আরো উল্লেখ্য যে এই ধারা অনুযায়ী যে মানুষটি নাগরিকত্বের আবেদন করছেন, ঐ আবেদন গৃহীত হবার তারিখের আগের থেকে সেই মানুষটি যে সব সুবিধা এবং অধিকার ভোগ করছিলেন, এই আবেদন করার জন্য, সেগুলি থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না।

(৪) এই ধারায় বর্ণিত কোন কিছুই সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগে উল্লিখিত আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরার উপজাতি অঞ্চলে এবং বঙ্গীয় পূর্ব সীমান্ত বিধেয়ক ১৮৭৩-এ নির্দেশিত “অন্তর্বর্তী সীমা” অঞ্চলে প্রযুক্ত হবে না।

(৭ঘ ধারার সংশোধনী)

৪। মূল আইনের ৭ ঘ ধারাতে,-

(১) শর্ত (ঘ) এর পর, নিম্নলিখিত শর্তটি সংযুক্ত করা হল, যেগুলি হল:-

“(ঘক) ভারতের বহিঃ-নাগরিক পত্রের ধারকরা যদি এই বিধির কোন নিয়ম বা ওই সময়ে প্রচলিত কেন্দ্র সরকার কর্তৃক নিজস্ব সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দ্বারা নির্দেশিত অন্য কোন আইন লঙ্ঘন করে থাকেন; অথবা”;

(২) শর্ত (চ) এর পরে নিম্নলিখিত নিয়মটি সংযোজিত হল, যেগুলি হল:-

“যতক্ষণ না ভারতের বহিঃ-নাগরিক পত্র ধারকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথোপযুক্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই ধারার বলে কোন আদেশ জারি করা যাবে না।”

(১৮ নম্বর ধারার সংশোধনী)

৫। মূল আইনের ১৮ নম্বর ধারার (২) নম্বর উপধারায় (গগ) শর্তের পরে নিম্নলিখিত শর্তটি যুক্ত হবে। যেগুলি হল:-

(গগঝ) নথিভুক্তির শংসাপত্র বা স্বাভাবিকী করণের শংসাপত্র দেবার শর্ত, বিধিনিষেধ ও উপায় ৬খ ধারার (১) নম্বর উপধারা অনুসারে

(তৃতীয় ভাগের সংশোধনী)

৬। মূল আইনের তৃতীয় ভাগের (ঘ) শর্তে, নিম্নলিখিত নিয়ম সংযুক্ত হল, যেগুলি হল:-

“বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অর্থাৎ হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে, উক্ত শর্তের হিসেবে, ভারত সরকারের অন্তর্গত বাস বা চাকরির গড় প্রমান, “এগারো বছরের কম নয়” এর বদলে “পাঁচ বৎসরের কম নয়” হিসেবে পড়তে হবে।”

(মূল ইংরেজি থেকে সরল বাংলায় অনূদিত)

One thought on “নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯

Add yours

Leave a comment

Blog at WordPress.com.

Up ↑

Design a site like this with WordPress.com
Get started